শিরোনাম

সরাইলের বিখ্যাত গ্রে-হাউন্ড কুকুর বিলুপ্তির পথে সংরক্ষণে প্রয়োজন সরকারি বেসরকারি উদ্যোগ

স্টাফ রিপোর্টার : | রবিবার, ০১ এপ্রিল ২০১৮ | পড়া হয়েছে 702 বার

সরাইলের বিখ্যাত গ্রে-হাউন্ড কুকুর বিলুপ্তির পথে সংরক্ষণে প্রয়োজন সরকারি বেসরকারি উদ্যোগ

প্রাচীণ কাল থেকেই বহু গুণে গুণান্বিত এই ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ভারত উপমহাদেশে এই জেলা শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ভাবে অনেক অগ্রসর ছিল। কালের বিবর্তনে অনেক কিছুই আজ বিলুপ্তির পথে । তার মধ্যে বিখ্যাত গ্রে-হাউন্ড কুকুর। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার গ্রে-হাউন্ড কুকুরের পরিচিতি রয়েছে উপমহাদেশ জুড়ে। দেশ বিদেশ থেকে এখানে কুকুর কিনতে আসে অনেক মানুষ। রক্ষণাবেক্ষণ আর বাজারে খাদ্যের উর্ধ্বগতির কারণে এই বিখ্যাত প্রাণীটি বর্তমানে অনেকটাই বিলুপ্তির পথে।

প্রকৃতিগত ভাবে দেখতে এরা সাধারণ কুকুর থেকে কিছুটা আলাদা। মুখটা দেখতে অনেকটা শেয়ালের মতো আর লম্বা দুটো কান। সাদা, কালো, লালসহ বিভিন্ন রঙের এসব কুকুর এক সময় ব্যবহার করা হতো শিকারের কাজে। শিয়াল, বনবিড়াল, বাঘডাস আর চোর-ডাকাতদের কাছ থেকে মালিকের বাড়ি পাহারায় তাদের পারদর্শীতা অনেক বেশিই । তাই এই গ্রে-হাউন্ডকে ভয় পায় সকলেই। সরাইলের এসব বিখ্যাত গ্রে-হাউন্ড কুকুরের দামটাও অনেক বেশি। একটা বাচ্চা কুকুর ২৫-৩০ হাজার টাকা, আর বড় কুকুর ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়।


তথ্য অভিজ্ঞমহলের মতে, আজ থেকে ২০/২৫ বছর পূর্বে প্রায় প্রতিটি গ্রাম ও মহল্লায় হাউন্ড কুকুর চোখে পড়তো এবং সারারাত ধরে শোনা যেত হাউন্ড কুকুরের গগনভেদী ঘেউ ঘেউ শব্দ। সরাইলের সু প্রসিদ্ধ হাউন্ড কুকুর প্রতিপালন ছিল অনেকের অত্যন্ত সৌখিনতা ও আনন্দ উপভোগের ব্যাপার। খুবই প্রভুভক্ত, পাহারাদার, শিকারী এই হাউন্ড কুকুর বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও সুপরিচিত।

প্রায় ৩/৪ ফুট দীর্ঘ এই হাউন্ড কুকুরের দেহ ও মুখ অন্যান্য কুকুরের চেয়ে একটু লম্বা। এটা অযথা ঘেউ ঘেউ করেনা, খুবই হিংস্র শিকারী ও প্রভুভক্ত বটে। সরাইলের হাউন্ড কুকুর তথা গ্রে-হাউন্ডের ইতিহাস সু-প্রাচীণ। আরবজাহান ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চার হাজার বছর ধরে রাজা বাদশা জমিদারেরা যুগ যুগ ধরে এই কুকুর পালন করে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় সরাইলের জমিদারদের প্রচেষ্টায় সরাইলেও এই ঐতিহ্য সু-প্রাচীণ কাল থেকে চলে আসছে। উন্নত বিশ্বে দিন দিন গ্রে-হাউন্ডের কদর বাড়ছে, পক্ষন্তরে সরাইলে এ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বিগত বেশ কয়েক বছর আগেও সরাইল উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গ্রে-হাউন্ডের প্রদর্শনী হতো। তাতে ভাল ভাল কুকুরের গুণগত মান যাচাই করে পুরস্কৃত করা হতো। এখন প্রদর্শনীতো দুরের কথা, হাউন্ড কুকুর নেই বললেই চলে। ইতিপূর্বে দেশ বিদেশ থেকে অনেক সৌখিন ব্যক্তি হাউন্ড কুকুর এর বাচ্চা ক্রয়ের জন্য গাড়ি হাঁকিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল আসতেন। এখন আর তেমন আসেনা না।

১৯৭৮ সালে তৎকালীন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সরাইলে আনসার ভি ডি পি অফিসের সামনে একটি হাউন্ড কুকুর সংরক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও উপযুক্ত চিকিৎসা, প্রজনন সুবিধার অভাব, সুষ্ঠু পরিচালনা ও আর্থিক সংকটের কারণে উক্ত কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। একসময় এ অঞ্চলের বিভিন্ন বাড়িতে কেউ শখের বশে, আবার কেউ আভিজাত্যের জন্য পালন করতো এই বিখ্যাত কুকুর। বর্তমানে উপজেলার নোয়াগাঁও, শাহজাদাপুর ও ধিতপুর এলাকায় কয়েকটি পরিবার এই কুকুর পালন ধরে রেখেছে।

সরাইলের এই গ্রে-হাউন্ডের উৎপত্তি সম্বন্ধে কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি বলেন, সরাইলে বহুকাল আগে এক দেওয়ান সাহেব হাতি নিয়ে সরাইল পরগনা থেকে কলকাতা যাচ্ছিলেন। পরে তিনি হাতির বিনিময়ে মালিকের কাছ থেকে কুকুরটি নিয়ে আসেন। পরে শিয়ালের সাথে মিলনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে এই জাতের কুকুর। আবার অনেকে বলে থাকেন, দেওয়ান সাহেব একদিন জঙ্গলে শিকার করতে এই কুকুর নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে এই মা কুকুরটি হারিয়ে গিয়েছিল। কিছুদিন পর সে আবার ফিরে আসে। তখন সে মা কুকুরটি বাঘের সাথে মিলনের ফলে শিকারি প্রকৃতির এই গ্রে-হাউন্ড কুকুরের উৎপত্তি।

বর্তমানে সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ঐতিহ্যবাহী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের এই বিরল প্রজাতির মূল্যবান হাউন্ড কুকুর বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অনতিবিলম্বে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে, বেসরকারী উদ্যোগে হাউন্ড কুকুর উৎপাদন এবং বাজার জাত করার উদ্যোগ নিলে বিশ্ববিখ্যাত হাউন্ড কুকুর বিলুপ্ত হওয়ার কবল থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে অভিজ্ঞজনদের সাথে কথা বললে তারা বলেন, দেশের ঐতিহ্যের সাথে এই গ্রে-হাউন্ড জড়িত। তাই এটিকে আবারও পুরোদমে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু ব্যবস্থা করা দরকার সরকারের পশুপালন বিভাগ তথা যথাযথ কর্তৃপক্ষের। সরাইলের গ্রে-হাউন্ড ধ্বংস হতে দেওয়া যাবেনা এমনটাই মনে করেন অভিজ্ঞমহল।

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮