শিরোনাম

শেখ হাসিনা সড়ককে ঘিরে বিজয়নগরবাসীর স্বপ্ন : উপ-শহর গড়ে উঠবে আশাবাদ লোকজনের

শামীম উন বাছির : | বৃহস্পতিবার, ০৪ জানুয়ারি ২০১৮ | পড়া হয়েছে 534 বার

শেখ হাসিনা সড়ককে ঘিরে বিজয়নগরবাসীর স্বপ্ন : উপ-শহর গড়ে উঠবে আশাবাদ লোকজনের

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরের সাথে বিজয়নগরবাসীর সরাসরি যোগাযোগ সড়ক ‘শেখ হাসিনা সড়ক’ এর নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই বদলে যাচ্ছে বিজয়নগরের ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা। বিজয়নগরের চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের যে জমির দাম এক সময় ছিল নাম মাত্র। রাস্তার নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার পর সেই জমির দাম বেড়ে গেছে বহুগুণ। নামমাত্র টাকাতেই এক সময় জমি-বেচা কেনা হলেও অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধির কারনে এখন কেউ সহজে জমি বিক্রি করেনা। চরাঞ্চলের মাটি এখন সোনায় পরিণত হয়েছে। শেখ হাসিনা সড়কটি নির্মিত হলে সেখানে উপ-শহর গড়ে উঠবে সেই চিন্তা থেকে বেশ কয়েকটি হাউজিং প্রকল্প ইতিমধ্যেই সেখানে জমি কিনেছে। এছাড়াও ভবিষ্যতে বাড়ি করার জন্য, কেউ কেউ চড়ামূল্যে জমি বিক্রি করার আশায় চরাঞ্চলে জমি কিনেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শেখ হাসিনা সড়কের নির্মাণ কাজ শুরুর আগে বিজয়নগরের চরাঞ্চলে এককানি জমি (৩০ শতাংশ) বিক্রি হতো ৪০/৫০ হাজার টাকায়। বর্তমানে সেই জমি বিক্রি হয় ৫/৬ লাখ টাকায়। বর্তমানে চড়া দামেও স্থানীয়রা হাতছাড়া করতে চাচ্ছেন না তাদের জমি। শেখ হাসিনা সড়ক বিজয়নগরবাসীকে দেখাচ্ছে রঙিন স্বপ্ন।

বর্তমানে উপজেলার ভাটি এলাকা বলে পরিচিত পত্তন ইউনিয়নের দত্তখোলা ও ভাতারখোলা এলাকায় সড়কে মাটি ফেলার কাজ চলছে পুরোদমে। ইতিমধ্যেই প্রায় ১০ কিলোমিটার লম্বা সড়কের ৮ কিলোমিটার সড়কে মাটি ফেলার কাজ শেষ হয়েছে। আগামী মাস তিনেকের মধ্যেই সড়কের মাটি ফেলার কাজ শেষ হবে বলে আশা করছেন ঠিকাদারের লোকেরা। তারপর শুরু হবে সড়কের গাইডওয়াল, ব্লক স্থান ও তিনটি ব্রীজ নির্মানের কাজ। ইতিমধ্যে ১১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি ব্রীজ নির্মানের প্রাক্কলন প্রস্তুত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। আগামী কিছুদিনের মধ্যেই ব্রীজের নির্মাণ কাজের টেন্ডার হওয়ার কথা রয়েছে।


এদিকে শেখ হাসিনা সড়কের নির্মাণ কাজ দ্রুত শেষ করার দাবিতে গত ১৪ ডিসেম্বর সড়কের বিভিন্ন প্রান্তে মানববন্ধন করে বিজয়নগরবাসী। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার লম্বা শেখ হাসিনা সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে উপজেলার ১০ ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ অংশ নেয়। মানববন্ধন চলাকালে বিভিন্ন পয়েন্টে বক্তব্য রাখেন বিজয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোঃ জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া, সাধারন সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাডঃ তানবীর ভূঁইয়া, ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ বাবুল আক্তার, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ফয়জুন্নাহার টুনি, পত্তন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ কামরুজ্জামান রতন, চম্পকনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হামিদুল হক, ইছাপুরা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জিয়াউল হক বকুল, বুধন্তী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জিতু মিয়া প্রমুখ।

মানববন্ধনে উপস্থিত পত্তন ইউনিয়নের আতকাপাড়া গ্রামের হাফেজ মজিবুর রহমান জানান, শেখ হাসিনা সড়কটি আমাদের শত বছরের প্রানের দাবি। বর্তমান সরকারের আমলে স্থানীয় সংসদ সদস্য র.আ.ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর নিরলস প্রচেষ্টায় সড়কটি বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সড়কের পাশে আমারও দুই কানি জমি (৬০ শতক) জায়গা আছে। সেখান থেকে সড়কের জন্য মাটি কাট হচ্ছে, তবে এতে তার কোন আপত্তি নাই। তিনি বলেন, আমার ৬০ শতক জায়গার সকল মাটি নিয়ে গেলেও আমি সড়কের নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন চাই।

মানববন্ধনে আসা পত্তন ইউনিয়নের মনিপুর গ্রামের ৮০ বছর বয়সী ময়দর আলী বলেন, সড়কের প্রয়োজনে আমার জমির যদি অনেক গভীর করেও মাটি আনা হয় তাতে আমার কোন আপত্তি নেই। আমি চাই রাস্তাটির নির্মাণ কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন করা হউক। তিনি রাস্তাটির নির্মাণ কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহবান জানান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে গত ২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর বিজয়নগর উপজেলার পত্তন ইউনিয়নের টানমনিপাড়া (পত্তন শিবির) এলাকায় সড়কের মাটি ভরাট কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি র.আ.ম. উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। সড়কের মাটি কাটার কাজের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৯ কোটি টাকা। ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ডলি কনস্ট্রাকশন’ নামক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এর নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করছে।

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর থেকেই শুরু হয় সড়কে মাটি ফেলার কাজ। প্রায় ১০ কিলোমিটার লম্বা এবং ২৪ফুট প্রস্ত এই সড়কের বর্তমানে প্রায় ৮ কিলোমিটারে মাটি ফেলার কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে উপজেলার পত্তন ইউনিয়নের দত্তখোলা ও ভাতারখোলা এলাকায় মাটি ফেলার কাজ চলছে।

সড়কটি নিয়ে উপজেলার চর-ইসলামপুর গ্রামের জামাল মিয়া বলেন, উপজেলার ১০ ইউনিয়নবাসীর প্রানের দাবি ‘শেখ হাসিনা সড়ক’। তিনি বলেন, বিজয়নগরের সাথে জেলা সদরে যাওয়ার কোন সড়ক না থাকায় অনেক সময় গর্ভবতী মহিলা ও অসুস্থ্য রোগীকে আখাউড়া অথবা সরাইল উপজেলার উপর দিয়ে জেলা সদরে নেওয়ার পথে পথিমধ্যেই রোগী মারা যায়। গত ৭ ডিসেম্বর দুপুরেও দক্ষিণ রাজাবাড়ি গ্রামের দয়াল সরকার-(৪০) নামক এক ব্যক্তি অসুস্থ্য হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়। জামাল মিয়া তিনি দ্রুত সড়কের নির্মাণ কাজ শেষ করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।

চর ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৯নং ওয়ার্ডের সদস্য জালাল উদ্দিন বলেন, সড়কের মাটি ফেলার কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই এলাকায় জমির দাম বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, আগে এখানে এককানি (৩০শতাংশ) জমি বিক্রি হতো ৫০ হাজার টাকায়। বর্তমানে এককানি জমি বিক্রি হচ্ছে ৪/৫ লাখ টাকায়। তিনি বলেন, আমাদের বাপ-দাদারা এই সড়কের স্বপ্ন দেখতেন। প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় অনেক প্রার্থী এই সড়ক নির্মানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমাদের ভোট নিলেও সড়ক নির্মাণ করেননি। বর্তমান সরকারের আমলে মোকতাদির চৌধুরী এমপি সড়কটির নির্মাণ করছেন।

পত্তন ইউনিয়নের মনিপুর গ্রামের আক্তার হোসেন বলেন, সড়কের পাশে তার ২০ কানি জমি আছে। সড়কের প্রয়োজনে তার ২০ কানি জমির মাটি নিয়ে গেলেও তার কোন আপত্তি নেই। তিনি চান দ্রুত সড়কটি নির্মিত হউক।
চর-ইসলামপুর ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের কৃষক জমসিদ মিয়া বলেন, সড়কের পাশে আমার কিছু জমি আছে। রাস্তার প্রয়োজনে আমি জমি থেকে মাটি দিয়েছি। তিনি বলেন, রাস্তাটি হওয়ার কারনে তার জমির দাম বেড়ে গেছে।
চর-ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নং ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য মোঃ শামীম বলেন, সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ হলে বিজয়নগর হবে একটি সমৃদ্ধ উপজেলা। বিজয়নগরের উৎপাদিত কৃষি পন্য খুব সহজেই বিভিন্ন জেলায় পাঠানো যাবে। কৃষক স্বল্প খরচে চরে উৎপাদিত ধান বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবে। তিনি বলেন, সড়কটি নির্মানের সাথে সাথে আমাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি সড়কটির নির্মাণ কাজ করার জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য মোকতাদির চৌধুরী এম.পি’কে ধন্যবাদ জানান।

এ ব্যাপারে বিজয়নগর উপজেলার ইছাপুরা ইউনিয়নের মীর্জাপুরের বাসিন্দা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক দীপক চৌধুরী বাপ্পী বলেন, নির্মাণাধীন শেখ হাসিনা সড়কটি বিজয়নগরবাসীর জন্য একটি পদ্মাসেতু। এটি আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। আমাদের স্বপ্ন এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সড়কের নির্মাণ কাজ শেষ হলে বিজয়নগরবাসী মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই জেলা সদরে আসা-যাওয়া করতে পারবে। এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা সহজে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গিয়ে পড়াশুনা করতে পারবে। সড়কটি চালু হলে বিজয়নগর উপজেলার চেহারা পাল্টে যাবে। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বিজয়নগরে জমির দাম বাড়বে। বিজয়নগরে একটি উপশহর গড়ে উঠবে।

এ ব্যাপারে বিজয়নগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডঃ তানভীর ভূইয়া বলেন, শেখ হাসিনা সড়কটি বিজয়নগরবাসীর অস্তিত্ব, আমাদের প্রাণের দাবি। তিনি বলেন, সড়কের নির্মাণ কাজ শেষ হলে উপজেলাবাসী মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে জেলা সদরে যাওয়া আসা করতে পারবে। এখন আখাউড়া অথবা সরাইল উপজেলার উপর দিয়ে জেলা সদরে যেতে সময় লাগে দেড় ঘন্টা। তিনি বলেন, সড়কটি নির্মিত হলে বিজয়নগরের ভাটি অঞ্চলে উপ-শহর গড়ে উঠবে। জায়গার দাম বেড়ে যাওয়ায় বিজয়নগরের ৫/৬টি গ্রামের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হবে। এলাকায় শিক্ষিতের হার বাড়বে। তিনি সড়কটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করায় স্থানীয় সংসদ সদস্য র.আ.ম. উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিজয়নগরবাসীর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আবদুর রাজ্জাক বলেন,শেখ হাসিনা সড়কটি বিশ্ব ব্যাংকের একটি প্রকল্প। তিনি বলেন, আগামী এপ্রিল মাসের মধ্যে সড়কে মাটি ফেলার কাজ শেষ হবে। তারপর শুরু হবে সড়কের পাশে গাইড ওয়াল ও ব্লক বসানোর কাজ। তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই ১১৬ কোটি টাকা ব্যায়ে সড়কে তিনটি ব্রীজের প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হয়েছে। আগামী কিছুদিনের মধ্যেই ব্রীজ নির্মাণ কাজের টেন্ডার হবে। তিনি সড়কের গুনগত মান নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১