শিরোনাম

মাদকবিরোধী অভিযান : প্রবেশপথে নজর নেই

বিশেষ প্রতিনিধি : | শুক্রবার, ২৫ মে ২০১৮ | পড়া হয়েছে 177 বার

মাদকবিরোধী অভিযান : প্রবেশপথে নজর নেই

চলমান মাদকবিরোধী অভিযান কঠোর থেকে কঠোরতর হচ্ছে। প্রতিদিন নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহীনি এসব ঘটনাকে বর্ণনা করে আসছে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হিসেবে। নিহতের সংখ্যা ইতোমধ্যেই (বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত) ৪০ ছাড়িয়ে গেছে। অভিযানে একের পর এক নিহতের ঘটনা ঘটতে থাকলে অতি সম্প্রতি বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং অনেক মানবাধিকার সংস্থা এ ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে মাদক বাণিজ্য হুট করে গড়ে ওঠেনি। দীর্ঘদিন ধরে চলতে চলতে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গেড়ে বসেছে কোটি কোটি টাকার এ বাণিজ্য। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান করতে হলে তাই সর্বাগ্রে এর শেকড় নিয়ে ভাবা উচিত। ভাসা ভাসা এমন অভিযান দিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলে তাতে সফল হওয়া যাবে না। মাদকের শেকড় অনুসন্ধান করতে গেলে প্রথমেই আসে এর উৎসমূলের কথা। সেই উৎমূল বন্ধ না করে বিভিন্ন স্থানে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। জানা গেছে, ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের প্রায় ১১শ পয়েন্ট দিয়ে দেশে মাদক ঢুকছে। এর মধ্যে কক্সবাজারের ৪৯টি পয়েন্ট দিয়ে ঢুকছে লাখো ইয়াবা ট্যাবলেট। মাদকের প্রবেশদ্বার গুলো খোলা রেখে এমন অভিযানের সফলতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করা হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে।


নির্দিষ্ট পয়েন্ট দিয়ে মাদক প্রবেশের পর সিন্ডিকেটের ছড়িয়ে থাকা শক্তিশালী জালের মাধ্যমে সহজেই তা ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। যদি অভিযানের মাধ্যমে শুধু ‘বাহক’দের ধরা হয় কিংবা বন্দুকযুদ্ধের মধ্যে ফেলা হয় তাহলে অক্ষত থেকে যাবে প্রবেশপথের গডফাদাররা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র অনুযায়ী, কয়েক বছর আগেও প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের সাড়ে ৫শ’ পয়েন্ট দিয়ে মাদকদ্রব্য প্রবেশ করতো। বর্তমানে প্রায় ১১শ’ পয়েন্ট দিয়ে মাদকদ্রব্য ঢুকছে। এর মধ্যে কক্সবাজারেই ৪৯টি। কক্সবাজারের সাগরপথ, সড়কপথ ও বান্দরবানের গহীন পাহাড়ি অঞ্চল হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে ইয়াবা ট্যাবলেট। অন্যদিকে ফেনসিডিল, কোকেন, হেরোইনসহ অন্য মাদকদ্রব্য ঢুকছে ফেনী, কুমিল্লা, সাতক্ষীরা, দিনাজপুর, চাঁপাই নবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, যশোর জেলার সীমান্ত দিয়ে। সীমান্তের যেসব পয়েন্ট দিয়ে মাদক ঢুকছে সেসব পয়েন্টগুলোর একটা তালিকা তৈরি করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এ অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিম সীমান্তে যশোরের বেনাপোল, পাটখালী, চৌগাছা, ঝিকরগাছা, শার্শা, সাতক্ষীরার কলারোয়া, দেবহাটা, ভোমরা, কুলিয়া, চুয়াডাঙ্গার মহেশপুর, জীবননগর, মেহেরপুরের মুজিবনগর, মেহেরপুর সদর, রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট, রাজশাহী সদর, গোদাগাড়ী, চাঁপাই নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর, জয়পুরহাটের পাঁচবিবি, জয়পুরহাট সদর, দিনাজপুরের ফুলবাড়ী, বিরামপুর, হিলি, হাকিমপুর, বিরলা ও পোরশা, পূর্ব সীমান্তে সিলেটের জকিগঞ্জ, চুনারুঘাট, মাধবপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা, আখাউড়া, বিজয়নগর, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, বিবিরবাজার, ফেনীর ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী ও পরশুরাম, উত্তর সীমান্তে কুড়িগ্রামের রৌমারী, নাগেশ্বরী, শেরপুরের শেরপুর সদর, ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা এবং দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে টেকনাফ ও উখিয়া দিয়ে অবাধে মাদক প্রবেশ করছে।

মাদকের সবচেয়ে বড় বাজার হলো রাজধানী ঢাকা। সূত্রমতে, রাজধানীতে মাদক আসে পাঁচটি পথে। এগুলো হলো- ভারত থেকে সাতক্ষীরা ও যশোর হয়ে সড়কপথে, রেলপথে আখাউড়া হয়ে, চাঁপাই নবাবগঞ্জ, রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চল থেকে সড়কপথে এবং কুমিল্লার বুড়িচং হয়ে সড়কপথে মাদকের চালান ঢাকায় পৌছে। তবে ইয়াবা ট্যাবলেট সব সময়ই কক্সবাজার থেকে আসছে। কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে রেলপথে ঢাকায় পৌছে ইয়াবার চালান। তারপর নৌপথে ইয়াবার চালান যাচ্ছে বিভিন্ন জেলায়।

কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সমুদ্রসৈকতে প্রশাসনের তল্লাশি চৌকি কিংবা নিয়মিত টহল চলে ঢিমেতালে। এ অঞ্চল দিয়ে প্রতিদিন শত শত ট্রলার সাগরে মাছ শিকারে গেলেও কোন্টি মাছ নিয়ে কূলে ভিড়ছে আর কোন্টি ইয়াবার চালান নিয়ে তা শনাক্ত করা কঠিন। এ সুযোগে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের ইয়াবা পাচারকারীরা প্রতিনিয়ত লাখো ইয়াবার চালান পাচার করছে। মিয়ানমার থেকে মাছ ধরা ট্রলারে ইয়াবার চালান বঙ্গোপসাগরের সেন্টমার্টিন দ্বীপের কাছাকাছি এসে বাংলাদেশি ট্রলারে হাতবদল হয়। এরপর ইয়াবা বহনকারী এ দেশীয় মাছের ট্রলারগুলো সুযোগ বুঝে কক্সবাজার থেকে শাহপরীর দ্বীপ সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে কূলে ভিড়ে নিরাপদে ইয়াবার চালান খালাস করে।

সাগরপথে পাচার হয়ে আসা ইয়াবার বড় চালান খালাস হয় টেকনাফ সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ, কাটাবনিয়া, খুরের মুখ, মুণ্ডার ডেইল, বাহারছড়া, টেকনাফ সদরের খোনকারপাড়া, মহেষখালিয়া পাড়া, পর্যটন মোড়, হাবিরছড়া, রাজারছড়া, বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীপাড়া, শামলাপুর, শীলখালী ও উখিয়ার ইনানী।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আগে থেকেই বারবার বলছেন, মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হতে হলে এ উৎসমূল গুলোতে নজরদারি জোরদার করার বিকল্প নেই। বিশেষ করে কক্সবাজারের সাগরপথে নজরদারি বাড়াতে হবে।

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১