শিরোনাম

ট্রাম্পের অভিবাসন পরিকল্পনা

ভয় বাড়ছে, বাড়ছে প্রতিরোধও

ডেস্ক রির্পোট : | শনিবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৬ | পড়া হয়েছে 388 বার

ভয় বাড়ছে, বাড়ছে প্রতিরোধও

প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তিনি সোয়া কোটি অবৈধ অভিবাসীকে বহিষ্কার করবেন এবং অবৈধ আগমন ঠেকাতে মেক্সিকো সীমান্তে একটি ‘সুন্দর’ দেয়াল বানাবেন—এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। তাঁর ওপর চাপ রয়েছে এই প্রতিশ্রুতি পালনে। সঙ্গে বহিষ্কার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধও বাড়ছে।

গত সপ্তাহে সিবিএস টেলিভিশনকে এক সাক্ষাৎকারে অবৈধ অভিবাসন বিষয়ে ট্রাম্প তাঁর পূর্ব প্রতিশ্রুতি থেকে কিছুটা সরে আসার ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে শুধু ২০-৩০ লাখ ‘অপরাধী’ বা ‘ক্রিমিনাল’, এমন অবৈধ অভিবাসীকে বহিষ্কার করা হবে। এরপরের কাজ হবে মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ। অন্য অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কারের প্রশ্ন শুধু তারপরেই বিবেচনা করা হবে। তবে একই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প অভিবাসীদের ‘চমৎকার’ মানুষ বলে উল্লেখ করেন। নির্বাচনের আগে তাদের অধিকাংশকেই তিনি ‘ধর্ষক ও মাদক ব্যবসায়ী’ বলে অভিযুক্ত করেছিলেন।


দেয়ালের ব্যাপারেও ট্রাম্পের অবস্থান বদলেছে। ঠিক দেয়াল (ওয়াল) নয়, এখন তিনি বেড়া (ফেন্স) নির্মাণের কথা বলা শুরু করেছেন। নির্বাচনের আগে তাঁর অঙ্গীকার ছিল, দুই দেশের মধ্যে ১ হাজার ৯০০ মাইল দীর্ঘ সীমান্ত বরাবর অতি সুরক্ষিত দেয়াল নির্মাণ। সে কাজ সম্ভব নয় জেনে তিনি সিবিএসকে বলেছেন, এই সীমান্তের কোথাও কোথাও বেড়া দেওয়া হবে, তবে সবার আগে যা করা হবে, তা হলো দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত পাহারা বৃদ্ধি।

ট্রাম্পের সমর্থক হিসেবে পরিচিত টেক্সাসের কংগ্রেসম্যান জেফ সেশন্স ট্রাম্পের কথার ব্যাখ্যা হিসেবে বলেছেন, ‘দেয়াল আসলে বেড়া ও ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি করার একটি তুলনামূলক বর্ণনা মাত্র। তবে যেভাবে সম্ভব, নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’ তাঁর সে কথার উদ্ধৃতি দিয়ে পলিটিকো মন্তব্য করেছে, ট্রাম্পের দেয়াল এখন ভেঙে পড়ার অপেক্ষায়।

অভিবাসন প্রশ্নে ট্রাম্পের এই নমনীয়তায় কেউ কেউ আশ্বস্ত হয়েছেন, তবে তাঁরা এই ভেবে উদ্বিগ্ন যে নিজের সমর্থকদের খুশি করতে খুব দ্রুত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ওবামা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে শিশু হিসেবে আমেরিকায় আগত ৭ লাখ ৫০ হাজার অবৈধ কিশোর-তরুণকে স্বল্পকালীন বৈধ অবস্থানের যে সুযোগ দিয়েছেন, ট্রাম্প সম্ভবত সেই আদেশ বাতিল করবেন। কারণ, সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য তাঁর পাল্টা নির্বাহী আদেশই যথেষ্ট। প্রেসিডেন্ট ওবামা গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় এই আদেশ বাতিল না করতে তাঁকে অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্প সেই অনুরোধ রাখবেন কি না, তার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

এই অনিশ্চয়তার কারণে অবৈধ হিসেবে বিবেচিত এসব কিশোর-তরুণের মধ্যে প্রবল ভীতির সঞ্চার হয়েছে। তেমন কোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করে বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ মিছিল বেরিয়েছে। তবে অন্ততপক্ষে দুটি সরকারি সূত্র থেকে এসব বৈধ কাগজপত্রহীন অভিবাসী আশ্বাস পেয়েছে। এর অন্যতম হলো লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের নির্বাচিত নগর সরকার ও নিউইয়র্কের মেয়র বিল ডি ব্লাজিও।

লস অ্যাঞ্জেলেসের সিটি কাউন্সিলের সভাপতি হার্ব ওয়েসন জানিয়েছেন, অভিবাসীদের বহিষ্কারে তাঁরা সক্রিয় বিরোধিতা করবেন। ট্রাম্প প্রশাসন যদি তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়, তা আইনগতভাবে ঠেকানোর কথা তাঁরা বিবেচনা করছেন। এই শহরের পুলিশপ্রধান চার্লি বেক সংবাদমাধ্যমেকে জানিয়েছেন, ফেডারেল সরকার জোর করে বহিষ্কারের কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করলে তাঁর পুলিশ বিভাগ তাতে কোনো রকম সহযোগিতা করবে না। লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র এরিক গারসেটিও যেকোনো বহিষ্কার পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছেন। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার কৃষি অর্থনীতি পুরোপুরি অভিবাসী কৃষিশ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের ঢালাওভাবে বহিষ্কার করা হলে এই অঞ্চলের অর্থনীতি ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে বলে তিনি হুঁশিয়ার করেছেন।

ডেমোক্রেটিক শাসিত এই রাজ্যের বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতারা ওবামার কাছে অনুরোধ করেছেন, যে সাড়ে সাত লাখ তরুণকে স্বল্পকালীন বৈধতা দেওয়া হয়েছে, তাঁদের সবাইকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমা প্রদর্শন করা হোক। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য তেমন কোনো সম্ভাবনা আইনগতভাবে সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন।

এদিকে, নিউইয়র্কের মেয়র বিল ডি ব্লাজিও কাগজপত্রবিহীন অভিবাসীদের ঢালাওভাবে বহিষ্কারের বিরুদ্ধে তাঁর বিরোধিতার কথা নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছেন। বুধবার ট্রাম্প টাওয়ারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দপ্তরে তাঁরা ঘণ্টা খানেক মুখোমুখি আলোচনা করেন। পরে সাংবাদিকদের ডি ব্লাজিও বলেন, তাঁরা দুজন অভিবাসী বহিষ্কারসহ বিভিন্ন প্রশ্নে খোলামেলা আলোচনা করেছেন।

ডি ব্লাজিও বলেন, নিউইয়র্ক হচ্ছে অভিবাসীদের দ্বারা নির্মিত এক শহর। বহিষ্কারের বিরুদ্ধে নিজের মত জানিয়ে তিনি ট্রাম্পকে বলেছেন, এমন কোনো উদ্যোগ নিলে স্থানীয় সম্প্রদায় ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ অনিবার্য। ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর অভিবাসী ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক ঘটনা বেড়েছে, সে কথায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ডি ব্লাজিও বলেন, মুসলিমবিরোধী কোনো বহিষ্কার অভিযান এই শহরে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আরও উসকে দেবে। নিউইয়র্ক পুলিশ বাহিনীতে প্রায় এক হাজার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মুসলিম সদস্য রয়েছেন। ডি ব্লাজিও বলেন, এমন কিছু করা ঠিক হবে না, যার ফলে এই শহরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিঘ্নিত হয়।

নির্বাচনের আগে মুসলিমদের আগমন নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করে ট্রাম্প সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। নির্বাচনের ফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ওয়েবসাইট থেকে মুসলিমবিরোধী সেই বক্তব্য তুলে নেওয়া হয়। এটি মুসলিম অভিবাসন প্রশ্নে ট্রাম্পের নমনীয়তার লক্ষণ হিসেবে ধরা হলেও তাঁর সমর্থকদের অনেকে মুসলিমদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থানের পক্ষে দাবি তুলেছেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প মুসলিমদের ওপর নজরদারির জন্য একটি রেজিস্ট্রি বা তালিকা প্রস্তুতের কথা বলেছিলেন। অভিবাসন প্রশ্নে তাঁর পরামর্শদাতা ক্রিস কোবাশ গত সপ্তাহে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, এ ব্যাপারে আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে তাঁরা আলাপ-আলোচনা শুরু করেছেন। তবে ট্রাম্প বা তাঁর কোনো মুখপাত্র এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংবাদমাধ্যমকে দেননি।

ট্রাম্পের সমর্থকেরা এ ব্যাপারে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ আশা করছেন। ফক্স নিউজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের সমর্থক হিসেবে পরিচিত সাবেক সেনাসদস্য কার্ল হিগবি বলেছেন, মুসলিমদের নাম রেজিস্ট্রি করা মোটেই কোনো অসম্ভব ব্যাপার নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি-মার্কিন নাগরিকদের অন্তরীণ করার ব্যবস্থা হয়েছিল। ‘দেশের নিরাপত্তা সুরক্ষার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি মুসলিমদের জন্য কোনো রেজিস্ট্রির ব্যবস্থা করেন, আমার সে ব্যাপারে পূর্ণ সমর্থন থাকবে,’ বলেন তিনি।

কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশন্স বা কেয়ারের নিউইয়র্ক শাখার নির্বাহী প্রধান জাপানি কায়দায় ইন্টার্নমেন্ট ক্যাম্প নির্মাণের যেকোনো প্রস্তাবের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, আমেরিকার মানুষ এমন কোনো চেষ্টা সফল হতে দেবে না।

এদিকে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর অভিবাসী মুসলিমদের ওপর বিদ্বেষপ্রসূত ঘটনা বেড়ে গেছে। কেয়ার জানিয়েছে, হিজাব পরার জন্য বিদ্রূপাত্মক মন্তব্যের শিকার হয়েছেন ফারিহা নিজাম নামের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক তরুণী। ফারিহা তাঁর ফেসবুকে জানিয়েছেন, নিউইয়র্কে বাসে চড়ার সময় এক শ্বেতাঙ্গ দম্পতি মাথায় ইসলামি কায়দায় মাথা ঢেকে রাখার জন্য তাঁকে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করেন।

মুসলিমদের বিরুদ্ধে ‘হেট ক্রাইম’ বাড়ছে—মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল: মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধ বা ‘হেট ক্রাইম’ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল লরেটা লিঞ্চ। এফবিআইয়ের ২০১৫ সালের পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি জানিয়েছেন, এই সময়ে আমেরিকান মুসলিমদের বিরুদ্ধে হেট ক্রাইম ৬৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইহুদি, আফ্রিকান-আমেরিকান ও সমকামীদের বিরুদ্ধেও হেট ক্রাইম বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তিনি জানান।

মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল লিঞ্চ নির্বাচন-উত্তর সময়ে হেট ক্রাইম বৃদ্ধির ঘটনার দিকেও সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এসব
ঘটনা স্কুলে ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিবিশেষকে হয়রানি ও সহিংস আক্রমণের জন্য আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়েছে। সব ধরনের বিদ্বেষপ্রসূত ঘটনা অবিলম্বে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে জানাতে অনুরোধ করেছেন লিঞ্চ। ভিডিও বার্তায় তিনি আশ্বাস দেন, বহুজাতিক বৈচিত্র্য ও সব সম্প্রদায়ের মানুষের অন্তর্ভুক্তির যে নীতি ও মূল্যবোধ দ্বারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত, তা সমুন্নত রাখতে বিচার বিভাগ তার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে।

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০