শিরোনাম

পবিত্র আশুরা

নিউজ ডেস্ক | বুধবার, ১২ অক্টোবর ২০১৬ | পড়া হয়েছে 704 বার

পবিত্র আশুরা

আরবি প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখ। পবিত্র আশুরা। আজ থেকে প্রায় ১ হাজার ৩৩২ বছর আগে এই দিনে মহানবী হজরত মুহাম্মদের (স.) দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেন (রা.) কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন।কারবালার শোকাবহ এই দিন মুসলিম বিশ্বের কাছে ধর্মীয়ভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মুসলিম বিশ্বে এ দিনটি ত্যাগ ও শোকের প্রতীকের পাশাপাশি বিশেষ পবিত্র দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিনটি ভাবগাম্ভীর্য ও যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয় । এ উপলক্ষে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়।


এ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী , রাষ্ট্রপতি , বিরোধী দলীয় নেতা  পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন।

পবিত্র কুরআন পাকে আল্লাহ রাববুল আলামীন যে চারটি মাসকে অতি সম্মানিত মাস বলে ঘোষণা করেছেন ‘মাহে মুহরর্ম’ তার মধ্যে অন্যতম।

হিজরী সনের প্রথম মাস মুহরর্ম মাস। এটি একটি পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ মাস। ধর্মীয় ও বহু ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি বিজড়িত দিন এই মাসের ১০ই মুহরর্ম। ইসলামের ইতিহাসে এই দিনটিকে আশুরা দিবস বলে অভিহিত করা হয়েছে।

‘দশ’ বুঝাতে আরবী ভাষায় ‘আশুরা’ ব্যবহার করা হয়। ‘আশরা’ থেকে ‘আশুরা’ দশম দিবস।

ঐ দিন এক দিকে যেমন নাজাত-শুকরিয়া দিবস তেমনি কারবালার মরু প্রান্তরে নবী দৌহিত্র ইমাম হুসাইনের স্ব পরিবারে শহীদ হওয়ার হৃদয় বিদারক ঘটনার স্বারক তথা শোক দিবস হিসাবেও পরিচিত।

ঐদিন হযরত আলী (রা.) এর নয়ন মণি মা ফাতিমার কলিব্জার টুকরা ইমাম হুসাইনের স্বপরিবারের উনিশজন সদস্যসহ তাঁর বাহাত্তজন অনুসারীকে যে ভাবে ইয়জিদ বাহিনী কর্তৃক নির্মম ভাবে শাহাদত বরণ করতে হয়েছিল কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়কে যে ব্যথিত করবে তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। আর তাই মুহরর্ম মাসের আগ মনে নতুন করে মুসলমানদের হৃদয়ের নিভৃর্তে মুহরর্মের নির্মম স্মৃতি যেন সকল ঐতিহাসিক ঘটনাকে ম্লান করে দেয়। ঈমানদার মাত্রই এহেন নির্মম ঘটনায় মর্মাহত হবে এবং হওয়াই ঈমানের দাবী।

কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, আমাদের কিছু সংখ্যক অজ্ঞ মুসলমান কারবালার হৃদয় বিদারক ঘটনাকে স্মরণ করে নিজেদের মনগরা কিছু কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়ে এই দিনের তাৎপর্যকে ক্ষুণ্ণ করে। ঐদিন তারা এজিয়া তৈরি করে পথ ঘাটে বুক সাবরিয়ে মাতম করে। ইমাম হুসাইনের কৃত্রিম কবর তৈরি করে অনেসলামিক ‘কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়।

আসলে আশুরার দিনে যারা তাজীয়া তৈরি করে পথে প্রান্তরে পর্তন কুর্দন ও অন্যান্য অনৈসলামিক কমস্থানের মাধ্যমে ইমাম হুসাইন (রা.) এর স্মৃতি বিজড়িত ঘটনাকে লোক চোখে তুলে ধরতে চায় তা ইসলাম স্বীহত নয়।

যদিও অনেকের ধারণা কারবালার শোকাহত ও মর্মস্পশী ঘটনাই মুহরর্ম মাসের বৈশিষ্ট্য। আসলে তা ঠিক নয়। পৃথিবীর শুরু থেকেই মাহে মুহরর্মের দশম দিবস অতি পূণ্যময় ও তাৎপর্যপূর্ণ এবং এ মাসটি অত্যন্ত সম্মানীত ও মর্যাদাপূর্ণ হিসাবে বিবেচিত। জাহিলিয়তের যুগেও আরবের মুর্খরা এ মাসটিকে সবিশেষ গুরুত্ব দিত। এমনকী এ মাসকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ বিবেচনা করে অন্যায়, অবিচার, জুলুম-অত্যাচার, ঝগড়া-বিবাদ, দাঁঙ্গা-হাঙ্গামা, রাহাজানি ও যুদ্ধ-বিগ্রহ এড়িয়ে চলতো।

আশুরা শুধু উম্মতে মুহাম্মদীর জন্যই নয় বরং পূর্ববর্তী উম্মতের কাছেও একটি ফযিলতপূর্ণ দিন হিসাবে বিবেচিত হতেন। বিশেষ করে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানরা এ দিনটিকে খুব জাকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করে।

হযরত নবী করীম (সা.) মদীনা শরীকে হিজরত করে স্থানীয় ইয়াহুদীদের লক্ষ্য করলেন যে, তারা ১০ই মুহরর্মে রোযা রাখছে এবং আনন্দ-উৎসব করছে। হুজুর (সা.) তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন ‘কী ব্যাপার তোমরা আজকের দিনে রোযা রাখছ কেন?’

তার বললো আজকের দিনে আমাদের নবী হযরত মূসা (আ.) ফির আউনের অত্যাচার থেকে নাজাত পেয়েছিলেন আর ফির আউন তার দলবল সহ লোহিত সাগরে ডুবে মরেছিল। আল্লাহ্র কাছে তারই শোকরিয়া স্বরূপ আজকের দিন আমরা রোযা রাখি।

এ কথা শুনে নবী করীম (সা.) সাহাবীদেরকে বললেন ‘তোমরাও ১০ই মুহরর্মে রোজা রেখো।’ তবে আমলের দিক দিয়ে এ ব্যাপারে ইয়াহুদীদের বিরোধীতা কর।

অর্থাৎ মুসলিম স্বাতন্ত্র বজরায় রেখো আর তা হলো তোমরা দুটি রোযা রেখো একটি ১০ই মুহরর্ম দিনে আর একটি এর আগে বা পরে। (বুখারী মুসলিম ও আবু দাউদ)

স্মর্তব্য, ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুহরর্ম মাসের রোযা ছিল ফরজ। পরে মাহে রমযানের রোযা মুসলিম উম্মাহ্র জন্য ফরজ হলে আশুরার রোযা মুস্তাহাবে পরিণত হয়। (মুসলিম শরীফ)

বস্ত্তত: অতীতে আশুরা দিবসে যে সব স্মরণীয় ঘটনা ঘটেছে সেগুলো থেকে আমাদের চোখ বন্ধ রাখা সমীচীন হবে না। কেননা আদিকাল থেকে যুগে যুগে আশুরা দিবসে যে সকল ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হওয়ার কথা বিভিন্ন সূত্রে আমাদের কাছে পৌঁছে তা অস্বীকার করবার অবকাশ নেই। দৃষ্টান্ত স্বরূপ আমরা জেনেছি আল্লাহ্ রাববুল আলামীন যেদিন আকাশ, বাতাস, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, জান্নাত-জাহান্নাম, লউহু মাহফুজ ও যাবতীয় সৃষ্টি জীবের আত্মাসৃজন করেন, সে দিনটি ছিল ১০ই মুহরর্ম তথা আশুরা দিবস। শুধু তাই নয় বরং আদম (আ.) এর সৃষ্টি ও তা …… দিন ও ছিল ১০ই মহরর্ম হযরত নূহ (আ.) এর জাহাজ ৮০জন সহচর নিয়ে যেদিন নিরাপদে জুদী প’বতে অবতরণ করেছিল সে দিনটিও ছিল ১০ই মুহরর্ম। এভাবে হযরত ইউসুফ (আ.) এর কুপ থেকে উদ্ধার। আয়ুব (আ.) এর আরোগ্য লাভ, হযরত ইউনুস (আ.) এর মৎস উদর হতে মুক্তি লাভ।

মূসা (আ.) এর পরিত্রাণ, হযরত ইব্রাহীম (আ.) নমরুদের অগ্নিকুন্ড থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন সে দিনটিতে সে দিনটিও ছিল ১০ই মুহরর্ম। শুধু কী তাই? বরং ঐদিন অর্থাৎ ১০ইং মুহরর্মমেই হাশর ও কিয়ামত সংঘটিত হবে বলে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।

পরিশিউপরোল্লিখিত আলোচনায় আমরা একটা চিরন্তন সত্যের সন্ধান পেলাম আর তা হলো ১০ই মুহরর্ম দিনটি খুব মর্যাদার অধিকারী। সংগত কারণে এই দিনটি তথা আশুরার দিন শোকরিয়া আদায়ের দিন। পাশাপাশি শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করার দিন।

বস্ত্তত: যে আদমকে সমুন্নত রাখার জন্য ইমাম হুসাইন (রা.) একদিন কারবালার প্রান্তরে শহীদ হয়েছিলেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন সেই আদর্শকে আমাদের অাঁকড়ে ধরতে হবে। আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে ইসলামী মূল্যবোধকে জাগ্রত করার শপথ গ্রহণ করতে হবে। ঐদিন ভাজীয়া নিয়ে নর্তন-কুর্দন করার দিন নয়। আমাদের প্রত্যেককেই ঐ দিনটির যথার্থ মূল্যায়ন করতে হবে। আর তখনই মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে যখন আমরা এ মাসের ইতিহাসের প্রতি লক্ষ্য রেখে তা থেকে শিক্ষণীয়, বর্জনীয় ও করণীয় বিষয় এবং তার আদর্শ ও কার্যকলাপ আমাদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রিয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাস্তবায়ন করতে পারবো।

আল্লাহ্পাক আমাদের প্রত্যেককেই মুহরর্ম ও আশুরার প্রকৃত তাৎপর্য বুঝবার ও আমল করবার তৌফিক এনায়েত করুন। (আমীন)

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০