শিরোনাম

রাত সাড়ে নয়টা

নাসিরনগর সদরে সন্ধ্যার পরই ভুতুড়ে পরিবেশ

| সোমবার, ০৭ নভেম্বর ২০১৬ | পড়া হয়েছে 205 বার

নাসিরনগর সদরে সন্ধ্যার পরই ভুতুড়ে পরিবেশ

নাসিরনগর সদরে অবস্থিত পশু হাসপাতাল সংলগ্ন প্রধান সড়ক। ঘুটঘটে অন্ধকার, চারদিকে ঝিঁঝি পোকার শব্দ। আশপাশে বাড়িঘর থাকলেও কোনো রা শব্দ এ রাস্তায় থেকে শোনা যায় না। তখন একজন মাঝ বয়সী ব্যক্তি হাঁটছিলেন, একা। গন্তব্য গার্লস স্কুলের গলিতে অবস্থিত বন্ধুর বাসা। ওই সড়ক সংলগ্ন পুকুর অতিক্রম কালেই হঠাৎ কিছু পুলিশ সদস্য তার পথ আগলে দাঁড়ায়। শক্ত করে ডান হাত ধরে ফেলে ব্যক্তিটির, এরপর টর্চ লাইট জ্বালান পুলিশের একজন সদস্য।এরপর জিজ্ঞাসাবাদ। কে, কী নাম, কোথায় যাবেন, এতো রাতে কী, কোথা থেকে আসলেন, জানেন না এখানাকার পরিস্থিতি ইত্যাদি প্রশ্নের বান। ব্যক্তিটি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান। ঢোঁক গিলতে গিলতে ও কাঁপতে কাঁপতে সব প্রশ্নের জবাব দেন। জানান, নাম রিয়াদ, গন্তব্য গার্লস স্কুলের পেছনে, বন্ধুর বাসা, বাসায় একা ভাল লাগছে না,তাই বন্ধুর সঙ্গে ঘুমুতে যাবেন;বন্ধুর নাম,পিতার নাম,নিজ বাসার ঠিকানাও জানালেন সঙ্গে।
পুলিশ সদস্যরা তার দেহ তল্লাশি করে ছেড়ে দিতে দিতে বললেন,যান,এতো রাতে পারত পক্ষে রাস্তায় বের হবেন না।
সরেজমিনে এ ঘটনা চোখে পড়ে । শুধু এ সড়কেই নয়। গোটা নাসিরনগর সদরে এ ধরণের আরও কিছু জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি চোখে পড়ে।
রোববার রাত সাড়ে ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত নাসিরনগর গার্লস স্কুল এলাকা, দত্তপাড়া, কলেজ মোড়, পূর্ব পাড়া, ঘোষপাড়া, বাজার, থানার মোড়, শহীদ মিনার রোড, কোর্ট রোড, ডাক বাংলা রোড, পশু হাসপাতাল রোড, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রোডসহ কিছু পাড়া-মহল্লায় হেঁটে দেখা গেছে, রাস্তায় মানুষের স্বাভাবিক চলাচল নেই মোটেই, নেই কোনো ধরণের যানবাহন। বাজারের সব দোকান বন্ধ। রাত ৮টা থেকে প্রায় পৌনে ৯টা পর্যন্ত শুধুামাত্র অল্পকিছু ওষুধের দোকান খোলা দেখা যায়। সড়কে কনকনে বাতাস, মেঘলা আকাশ, টিপটিপ বৃষ্টি ঝরা, বিদ্যুৎ থাকা সত্বেও ঘুটঘুটে আঁধারি অবস্থায় পরিবেশটা ছিল ভৌতিকই। এমন পরিবেশে সংখ্য্য়া খুবই কম হলেও যারাই পথে চলছিলেন, পুলিশ তাকেই ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল ব্যাপকভাবে। ঠাসঠাস প্রশ্নের বান। কোনো ছাড় নেই। কারও সঙ্গে চড়া-কড়া ভাষাও ব্যবহার করা হচ্ছিল। জিজ্ঞাসাবাদ-তল্লাশির শিকার ৯জন ব্যক্তির সাক্ষাৎ পাওয়া গেছে। তারা পুরুষ, মাঝ বয়সীই বেশি। দেখা যায়, কথা বলে পুলিশের মোকাবিলা করতে তাদের কাঁপাকাঁপি অবস্থা। কেউ ঢোক গিলছিলেন, কাঁপছিলেন থরথরিয়ে, আমতা আমতা করছিলেন।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, মহল্লার ভেতর, প্রধান সড়কে পুলিশের টহল চলছে পায়ে হেঁটে, সিএনজি চালিত অটোরিকশায়, জীপ, মাইক্রোবাস, ডাবল পিকআপ ভ্যানে, মোটরসাইকেলে, নয়তো কোথাও ঠাঁই দাঁড়িয়ে। শুধু পোশাকধারী পুলিশই নয়, গোয়েন্দা পুলিশ, আর্মড পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব- সবাই যার যার মতো করে টহল দিচ্ছিল, মনে সন্দেহ জাগলে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল, প্রয়োজনে দেহও তল্লাশি করছিল।
নাসিরনগর মোড়ের দোকানি নারায়ণ বলেন, যে অবস্থা, ডরই করতাছে। কুত্তাও নাই রাস্তাত।
রাত ১১টার দিকে তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল কোর্টরোডে। যাচ্ছিলেন বাড়ি ঋষিপাড়ায়। তাকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে, আশুতোষ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় খেলার মাঠের কাছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি তো এন্দু (হিন্দু), কইছি। এরপরও ছারে না। যতলা কতা জিগাইছে, হয়রান লাইগ্গা গেছিন না। ডরও লাগছিন, আবারনি ধইরা নে গা।
কিছু বাড়ির খুব কাছাকাছি থেকে দেখা গেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনীর দলবদ্ধ বিচরণ, কথা থেকে সৃষ্ট শব্দে জেগে উঠেন ঘরের ভেতর থাকা লোকজন, লাইট জ্বালেন, মৃদু সুরে কথা শুরু করেন বাড়ির পরিস্থিতি নিয়ে। কিছু বাড়ির লোকজন ঘরে বসে এলাকার পরিস্থিতি নিয়ে গল্প করছেন, কিছু লোক ভয়ার্ত সুরে ঘরের ভেতরই আস্তে আস্তে কথা বলছেন।
রাত ১১টা ২০ মিনিটে ঘোষপাড়ার সুবাস বলেন, পুলিশের গাড়ির বাত্তিটা দেখলেই কইলজাটা চিপা দিয়া (কেঁপে) উঠে। চোখ লাগাইতেই পারি না। খুব ডর করে।
রাত সাড়ে ৮টার দিকে গাংকল পাড়ার নারায়ণ বলেন, কতখান (কিছুক্ষণ) পরপর পুলিশ আসে। ঘরের পিছন দিয়া হাটে, ঠাহর পাই। এমনেই আছি ডরে। আর এমনে পুলিশের আওয়াজ পাইলে কইলজাটা কাইপা উঠে। তখনই জিগাই কেডা? পুলিশ না হইয়া সন্ত্রাসীও তো হইতে পারে। পুলিশ কইলে তখনই একটু নিশ্চিন্ত হই, তারপরও ডর কী যায়?
সরেজমিনে রাত ১০টার দিকে যখন কলেজ মোড়ে যাওয়া হয়, তখন বিজিবির একটি টহল গাড়ি, কিছু পোশাকধারী পুলিশ সদস্য ও একটি র‌্যাবের টহল গাড়ি দাঁড়ানো ছিল।
সদর ইউপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে দেখা গেছে, বিজিবির ক্যাম্প। নাসিরনগর কলেজে দেখা যায়, র‌্যাবের ক্যাম্প, আশুতোষ স্কুলের মাঠের কোনায় একটি পাকা ঘরে পুলিশ ক্যাম্প, কমপ্লেক্স মসজিদ রোডের শেষ প্রান্ত যেখান দিয়ে ডাক বাংলা যেতে হয়, সে পথের গোড়াতেই আর্মড পুলিশের টহল দল চোখে পড়ে।
শুধু কী তাই? নাসিরনগর সদরের ১০টিরও বেশি এলাকা ঘোরার সময়, প্রতি দুইতিন মিনিট অন্তরঃ অন্তরঃ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি পাওয়া গেছে নানাভাবে।
কোনো কোনো স্থানে এ প্রতিবেদকও তাদের কাছে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশির শিকার হন।
দত্তবাড়ির এলাকায় এ প্রতিবেদকের সঙ্গে পরিচয় হয় পুলিশের একটি টহল দলের। তাদের দলে থাকা একজন এসআই বলেন, বুঝলেন, মনে কষ্ট নিয়েন না। অবস্থা খারাপ, কড়া অর্ডার, ভাল করে টহল দিতে হবে। যাকে পাব তাকেই তল্লাশি করব।
এছাড়া কোর্ট রোড, বাজার, কলেজ মোড়েও জিজ্ঞাসাবাদের শিকার হতে হয় এ প্রতিবেদককে।
গার্লস স্কুল এলাকার বাসিন্দা আহমদ হোসেন চৌধুরী এ প্রতিবেদকে বলেন, আপনি যে টাইমে রাস্তায় হেঁটেছেন, সে টাইমে রাস্তায় প্রচুর মানুষ থাকার কথা। পরিবহন চলার কথা। দোকানপাট খোলা থাকার কথা, বাজারই তো রাত ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকে। কিন্তু হামলা ঘটনার পর থেকে বিশেষ করে গত দুদিন পথেঘাটে, বাজারে নেমে এসেছে ভীষণ নীরবতা।
পশ্চিম পাড়ার ৫০ বছর বয়স্ক সমীর বলেন, জীবনেও নাসিরনগরে এমন পরিবেশ হয় নাই। এতো পুলিশ,র‌্যাব, বিজিবি জীবনেও এখানে মানুষ দেখে নাই। আর যে ধরণের ঘটনা ঘটছে, সে ধরণের ঘটনাও ঘটে নাই। মানুষ খুবই ভয়ে আছে।


আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০