শিরোনাম

নাসিরনগর জেলেপাড়া : ঘুরে দাঁড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা

| শুক্রবার, ১১ নভেম্বর ২০১৬ | পড়া হয়েছে 460 বার

নাসিরনগর জেলেপাড়া : ঘুরে দাঁড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা

শরীরের আঘাতে ভেঙে গেছে মন। থাকার ঘরটিও তছনছ। তাতে কি? বসে থাকার জো নেই।

তাইতো ভাঙা মন নিয়েই ছুটে চলা। জালে একটু-আধটু মাছ উঠতেই সে কি আনন্দ! এই বুঝি দু’মুঠো অন্নের জোগান হলো। এ যেন ঘুরে দাঁড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা।


নাসিরনগরের জেলেপাড়া হিসেবে পরিচিত গাঙ্কল পাড়ায় বুধ ও বৃহস্পতিবার সরেজমিন ঘুরে জেলেদের ঘুরে দাঁড়ানোর এই চিত্র চোখে পড়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, মেদী হাওরের পাড়ে বসে মাছ কুটছেন বেশ কয়েকজন নারী। তাদের সঙ্গে কাজে হাত লাগিয়েছেন পরিবারের শিশুরাও। আশপাশে দেখা গেল এমন আরো কয়েকটি দল।

জানতে চাইলে হাসিমুখে জানান, ভোর থেকেই জেলেরা মাছ নিয়ে পাড়ে আসছে। তখন থেকেই শুরু তাদের কর্মব্যস্ততা।

মাছ ধরে ফিরে আসা গোটা বিশেক নৌকা ঘাটে বাঁধা দেখা গেল। নাসিরনগরের মেদী হাওরের কূল ঘেঁষে গড়ে ওঠা গাঙ্কল পাড়ার প্রবেশমুখে চোখে পড়ল জনা দশেক জেলের। রাতভর মাছ ধরে সকালে বিক্রি শেষে আড্ডায় মেতেছেন তারা। তাদের মধ্যে পরিতোষ দাস, রাকেশ দাস এবং হরিলাল দাস জানান, গত ৩০ অক্টোবর মন্দির-বাড়িতে হামলার ঘটনায় গাঙ্কল পাড়ার কর্মব্যস্ততায় ছেদ পড়ে। কিন্তু আবার ফিরে এসেছে আগের চেহারা। জাল হাতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন তারা। যাচ্ছেন তাদের প্রাণের মেদী হাওরে।

তারা জানান, হাওরও তাদের দিচ্ছে দুই হাত ভরে। মেদী হাওরের উত্তর বাল্লা, দক্ষিণ বাল্লা, ঘাটুরিয়া, বালিয়াজুড়ি, ঠাটর, শর্মিদী, খোপা অংশে মাছ ধরেন এই জেলেরা।

বুধবার দুপুরে গাঙ্কল পাড়ায় অনিল দাসের বাড়ি গিয়ে দেখা যায় রান্নায় ব্যস্ত তার স্ত্রী জয়া রানী দাস। রাইজিংবিডিকে তিনি বলেন, ‘কতলা দিন পর আজকা ভালো কইরা বাজার হইছে। অতদিনত পেডে ভাত অই গেছেনা। গরিব মাইনষের জানডাই পুঁজি। হেইডার ডর থাকলে কামে যাইবো ক্যামনে।’

মেদী হাওরের পাড়ে বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে শুঁটকির মাচা। প্রতিটি মাচায় নানা জাতের মাছ শুঁটকি করার জন্য শুকাতে দেওয়া হয়েছে। সেখানেও কাজে ব্যস্ত নারী-পুরুষ। মাচার নিচে ছায়ায় মাছ কুটে শুঁটকি করার কাজে ব্যস্ত ভাণ্ডারি দাস (৫০), সুনীতি রানী দাস (৪০) ও ভানু রানী দাস (২৮)। তারা জানান, মাছ কাটার পর মাছের পেটের চর্বি তারা নিয়ে যান। সেই চর্বি সেদ্ধ করে বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করে তেল বের করে শুঁটকির মটকিতে দেওয়া হয়। প্রতিকেজি তেল বিক্রি হয় একশ থেকে দেড়শ টাকায়। এই গ্রামের অধিকাংশ নারী মাছ কুটার কাজ করে থাকেন। গত কয়েকদিনের ধরপাকড়ে এবং পুলিশ-র্যা বের উপস্থিতিতে তাদের সাহস বেড়েছে। ফলে কাজে ফিরেছেন তারা। আজও অন্তত ৩০ জন নারী এই কাজ করেছেন।

ক্ষীর মোহন দাস নামের এক জেলে জানান, ৩০ অক্টোবর হিন্দুদের মন্দির ও বাড়িঘরে হামলার পর শুঁটকি নিতে পাইকার আসা বন্ধ ছিল। তবে দুদিন ধরে তারা আবারও আসতে শুরু করেছেন। বৃহস্পতিবার কয়েকজন পাইকার গাঙ্কল পাড়ায় এসে শুঁটকি নিয়ে গেছেন। তবে আগে প্রতিদিন ৩০-৪০ জন পাইকার এখানে শুঁটকি নিতে আসতেন।

সুরেন্দ্র দাস নামে মাঝ বয়সি একজন বলেন, ঘটনার পর প্রতি রাতে এলাকায় পাহারা দিতাম। মনে আতঙ্ক থাকত কখন আবার হামলা হয়। তবে শত শত পুলিশ দেখে মনে সাহস বাড়ছে। তিনি জানান, মঙ্গলবার রাতভর মেদী হাওরের উত্তর বাল্লা এলাকায় মাছ ধরে সকালে ৫০০-৭০০ টাকার মাছ নিয়ে ফিরেছেন।

সুধাংশু দাস (৫০) বলেন, ‘জাল না থাকায় দেড়শ টাকা নৌকা ভাড়া এবং তেল খরচ দিয়ে টিকে থাকা কষ্টকর। ওই দিনের ঘটনায় অনেকেরই জাল পুড়িয়ে দিয়েছে হামলাকারীরা। ফলে শেয়ারে জাল বেয়ে মাছ বিক্রির টাকায় সংসার চালানো কষ্টকর। তারপরও আমরা প্রাণপণ চেষ্টা করছি ঘুরে দাঁড়ানোর।’

জয়া রানী দাস জানান, তার স্বামী জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনে বিভিন্ন হাটে বিক্রি করেন। কিন্তু এ ঘটনার পর থেকে তিনি আর কাজে যাচ্ছিলেন না। কিন্তু এলাকায় পুলিশ দেখে বুকে সাহস পাচ্ছেন। মঙ্গলবার থেকে তিনি আবারো কাজে যাচ্ছেন। বুধবারও ১৫০০ টাকার মাছ কিনে নূরপূর বাজারে বিক্রি করেছেন।

কিছু দূর এগিয়ে গিয়ে কথা হয় একই পাড়ার সুধন দাসের স্ত্রী শঙ্করি দাসের সঙ্গে। পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় মঙ্গলবার থেকে তার স্বামী আবারো বিলে যাচ্ছেন জানিয়ে বলেন, ‘এখন সংসারেও শান্তি আইছে।’ তিনি জানান, ঘটনার দিন দুই বোরকা পরা নারী তাদের ঘরে ঢুকে শোকেজ ভাঙেন।

বিলে গেলে কেউ জাল পুড়িয়ে দিতে পারে- এই ভয়ে ঘটনার পর থেকে টানা সাত দিন বিলে যাননি বলে জানান আরেক জেলে অনিল দাস। তবে স্বাভাবিক সময়ের মতই বুধবার সকালে মাছ নিয়ে বিল থেকে ফেরেন তিনি। বিক্রি করে পেয়েছেন ৪০০ টাকা। আরেক জেলে হরিপদ দাস জানান, ঘটনার দিন তার ১০ কেজি জাল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তারপর ঋণের ১০ হাজার টাকায় নতুন জাল কিনেছেন। সেই জাল নিয়েই গত কয়েকদিন হাওরে যাচ্ছেন তিনি।

হরিলাল দাস এবং বীরেন্দ্র দাস নামে দুই প্রবীণ জেলে জানান, একজনের ৫ কেজি এবং অন্যজনের ২০ কেজি জাল মেদী হাওরের পাড়েই জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার পর কয়েকদিন কাজে ছেদ পড়লেও আবার কাজ শুরু করেছেন। তবে নিজেদের জাল না থাকায় শেয়ারের ভিত্তিতে হাওরে মাছ ধরতে যাচ্ছেন।
সমীর চক্রবর্তী, নাসিরনগর থেকে
অনলাইন ডেস্ক

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০