শিরোনাম

দক্ষিণ এশীয় রাজনীতি এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক

| শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | পড়া হয়েছে 557 বার

দক্ষিণ এশীয় রাজনীতি এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক

জঙ্গিবাদ, যুদ্ধোন্মাদনা আর অসহিষ্ণুতার বিপরীতে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ-চীন-জাপানসহ দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্রগুলোকে। দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি, নিরাপত্তা, অগ্রগতি ও সুনাম নির্ভর করছে ভারত-পাকিস্তানের সুসম্পর্ক এবং যুদ্ধের উন্মাদনা থেকে সরে আসার শুভ উদ্যোগ গ্রহণের ওপর।

দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির জটিলায়ন এবং ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কের অবনতি ও যুদ্ধোন্মাদ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় সৈন্য সমাবেশ ঘটেছে পাকিস্তানে ১৮ সেপ্টেম্বর ১৮ সেনাসহ চার হামলাকারী নিহত হওয়ার পর। সেই ঘটনায় ৩৫ সৈন্যকে আহত অবস্থায় সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টারে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। এরপর এ নির্মম ঘটনার জন্য ভারত দায়ী করে পাকিস্তানকে। এ হামলায় ক্ষুব্ধ হয় ভারতবাসী। অমিতাভ বচ্চন এক টুইট বার্তায় লিখেছে ‘পাকিস্তান যুদ্ধ চাইলে ভারত তাই করুক।’ সেদিন ভারতবাসী এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিল যে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং তার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া সফর বাতিল করেন। গভীররাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বৈঠক করেন। ভারতীয় সেনাপ্রধান ঘোষণা দেন এই বলে যে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ভারতীয় সৈন্যরা প্রস্তুত আছে। এতে ভারতপ্রেমীরা খুশি হলেও শঙ্কিত হয়ে পড়ে আশপাশের রাষ্ট্রের জনগণ। কারণ অতীতে ভারতীয় উপমহাদেশে পাক-ভারত যুদ্ধের পরিস্থিতির কুফল ভোগ করতে হয়েছে তাদের। এক সময় ভারত-পাকিস্তান স্বাধীন হলেও পাকিস্তান জঙ্গিবাদের উন্মাদনায় জ্বলছে। প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো তার নির্মম শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক আস্তিক, মৌলবাদ, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও জেহাদি উন্মাদনাসহ নানা দুঃসহ পরিস্থিতিতে অতিষ্ঠ পাকিস্তানের জনগণ। এরফলে পাকিস্তানের মসজিদে সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। আলকায়েদা নেটওয়ার্কসহ নানা জঙ্গি সংগঠন শিকড় গেড়েছে সেখানে। প্রগতি, নারীমুক্তি, মানবতা আর সহিষ্ণুতা সেখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিপরীতে। রাজনৈতিক হত্যা, নৃশংসতা আর অস্ত্রব্যবসা চলছেই। ভারতও পারমাণবিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। উদীয়মান বিশ্বশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। নরেন্দ্র মোদি মার্কিন-রাশিয়াসহ মুসলিম দেশগুলো সফর করে সুসম্পর্ক সৃষ্টি করেছেন। তিনি পাকিস্তান সফর করেছেন। এদিকে আরেক উদীয়মান পরাশক্তি চীন তার বাজার বিস্তারে অনেক অগ্রসর এবং অর্থনীতির দিক দিয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত। এ রাষ্ট্রের রয়েছে নিরাপত্তার পর্যাপ্ত সক্ষমতা। চীন ও ভারত একসঙ্গে শান্তির অভিযাত্রায় হাঁটলে বিশ্বের বৃহত্তম পরাশক্তির রাষ্ট্র হতো দক্ষিণ এশিয়া। কিন্তু বাস্তবে সেটি হওয়ার নয়। ভারত-চীন সুসম্পর্ক থাকলেও আর্থিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতা প্রবল। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক কৌশলের কারণে এ দুটি বড় রাষ্ট্র নিয়ে সিদ্ধান্তগত জটিলতা রয়েছে। বিশ্বায়নের এ যুগে ভারত-চীন বিশ্বশক্তির মেরুকরণে নতুন বলয়। ভারতে দেড়শ কোটি জনসংখ্যা। চীনেও দেড়শ কোটির অধিক জনসংখ্যা। এছাড়া সম্পদসহ আরো শক্তিশালী রাষ্ট্র রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়। ভারতীয় সংস্কৃতির শক্তিশালী ভিত সহনশীলতা ও শান্তি হলেও প্রায়শ রাজনীতির জটিলায়নে সম্পর্কের অবনতি ঘটার আশঙ্কা বিদ্যমান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে যুদ্ধোন্মাদনায় ঠেলে দিয়ে স্বার্থ হাসিলেও তৎপর। কিন্তু সময় পাল্টেছে। ভারত ও চীন এ ব্যাপারে সতর্ক। সাগরে ড্রোন মোতায়েন করে এবং রণতরী ভাসিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করে। সাগরের দখলদারিত্ব এ প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করতে মার্কিন সৈন্যরা তৎপর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তার অজুহাতে সৈন্য সমাবেশ ও রণতরীর উপস্থিতি ঘটাতে চায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি সৃষ্টি হয়েছিল ভারতীয় উপমহাদেশে অশান্তির বীজ বপনের জন্য। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র থেকে এটি হয়ে ওঠেছে জঙ্গিবাদ বিস্তারের হাতিয়ার। বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছে। একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানের শোচনীয় পরাজয় ঘটেছিল। পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল বাংলাদেশ-ভারত মিত্রবাহিনীর কাছে। ভারতের প্রতি প্রতিশোধস্পৃহা রয়েছে পাকিস্তানের। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিও গভীর ষড়যন্ত্র বহমান। বাংলাদেশে স্বাধীনতার চার দশক পরও সেই ষড়যন্ত্রের প্রকাশ ঘটেছে যুদ্ধাপরাধের বিচার ক্ষেত্রে বারবার পাকিস্তানের নাক গলানোর মাধ্যমে। দেশের অভ্যন্তরের যুদ্ধাপরাধীরা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল অনুযায়ী শাস্তি পেয়েছে। তাতে বিএনপি-জামায়াত জোট সন্তুষ্ট নয়। সেই সঙ্গে সন্তুষ্ট নয় পাকিস্তানও। সরাসরি পাকিস্তানের মন্তব্য ও ভাষ্যের বিরোধিতা করেছে বাংলাদেশ সরকার। পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবিও উত্থাপিত হয়েছে। সরকার সেদিকে যায়নি। বিশ্বায়ন প্রেক্ষিত ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক বিবেচনা করে। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস বিস্তারে পাকিস্তানের সহায়তা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বারবার প্রমাণিত হলেও বাংলাদেশ শুধু প্রতিবাদ, নিন্দা ও সতর্কতার আহ্বান ছাড়া কিছুই করতে পারেনি। অন্যদিকে ভারতের সৈন্যরা সীমান্তে নিহত হওয়ার পরপর পাকিস্তানের প্রতি সমুচিত জবাব দিয়েছে ভারত। সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করে ভারত প্রস্তুতি নিয়েছে। পাকিস্তান যুদ্ধ চাইলে ভারত তা করতে প্রস্তুত। নরেন্দ্র মোদি এও বলেছেন যে, যুদ্ধ করার মতো অনেক বিষয় রয়েছে পাকিস্তানের। দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, সন্ত্রাস, অশান্তি ও জঙ্গিবাদ দূরীকরণে পাকিস্তান যুদ্ধ করতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর বারাক ওবামা বলেছিলেন একই ধরনের কথা। তিনি মুসলিম বিশ্বকে কোরানের আয়াত উল্লেখ করে শান্তির আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কোরানে আছে_ একজন নিরপরাধী মানুষ খুন হলে গোটা বিশ্বের মানুষকে হত্যা করার শামিল। এছাড়া মিথ্যাচারের রাজনীতি কতটা ভয়ঙ্কর তাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি কোরানের উদ্ধৃতি দিয়ে। সেটি হলো_ মিথ্যাচার হত্যার চেয়েও খারাপ। বারাক ওবামা ও নরেন্দ্র মোদি শান্তির সপক্ষে বলেই এ ধরনের কথা বলতে পেরেছেন। নরন্দ্রে মোদি ইসলামের শান্তির বাণী উচ্চারণ করেছেন পাকিস্তান সফরকালে। তিনি বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করেছিলেন। বাংলাদেশের যে কোনো বিপদে ভারত পাশে থাকার অঙ্গীকারও তিনি করেছেন। পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করলে বাংলাদেশও রেহাই পাবে না বলে উল্লেখ করেছেন। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ সম্পর্কের বৃদ্ধি ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন। শেখ মুজিবের অনুস্মরণে তার কন্যা দেশ শাসন করার প্রসঙ্গ তিনি বার বার উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, শেখ মুজিব বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন আর শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে রক্ষা করে চলেছেন। বাংলাদেশের জনগণ পাকিস্তানের গভীর ষড়যন্তের বিরুদ্ধে স্বোচ্চার। দক্ষিণ-এশীয় আন্দলনের শান্তি ও উন্নয়নের জন্য ১৯ বছর ধরে সার্ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও আসন্ন সার্ক সম্মেলন অনুষ্ঠান নিয়ে আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ভারত, আফগানিস্তানসহ বেশিরভাগ রাষ্ট্র সার্ক সম্মেলন নিয়ে অনীহা প্রকাশ করেছে পাকিস্তানের অপরিবর্তিত মনোভাবের কারণে। ভারত ও পাকিস্তান দুটিই পারমানবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। বিশ্বব্যাপী ভারতের সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা পাকিস্তানের চেয়ে বেশি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের বন্ধনের দৃঢ়তা বেড়েছে। যুদ্ধবিমান, সাবমেরিনসহ বহু উন্নত সমরাষ্ট্র রয়েছে ভারতের। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, ভারত পাঁচ মিনিটেই পাকিস্তান শেষ করে দিতে পারে। ভারত শক্তিধর রাষ্ট্র হলেও এ ধরনের হুমকি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ তাতে শুধু ভারত-পাকিস্তানের জনগণ নয়, আশপাশের রাষ্ট্রগুলোর জনগণও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে বিশ্বরাজনীতির জটিল মেরুকরণ তৈরি হবে। বাংলাদেশকে করিডোর হিসেবে পেতে চায় প্রভাবশালী রাষ্ট্রসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলো। উন্নয়নের মহাসড়কে পেঁৗছানো এবং আন্তঃযোগাযোগ ব্যবস্থায় যে অগ্রগতির স্বপ্ন দক্ষিণ এশিয়া দেখছে তাও ব্যর্থ হবে পাক-ভারত যুদ্ধ হলে। কাশ্মির জ্বলছে কয়েক দশক ধরে। রক্তাক্ত কাশ্মির অনেকটা শান্ত হলেও আজাদ কাশ্মির এবং বেলুচিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেই পাকিস্তানের। এ দুটি ভূখ-ের জনগণ আর পাকিস্তানের সঙ্গে থাকতে চায় না। তারা স্বাধীন ও স্বতন্ত্রসত্তা নিয়ে বিকশিত হতে চায়। এ অবস্থায় ভারতের শান্তিপূর্ণ মনোভাব এ সমঝোতা গুরুত্ব না দিলে পাকিস্তানকে ভোগাবে অনেক। ভারতে সহিংসতা ও অন্তর্ঘাত হানলেও বড় আকারে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় তেহরিক-ই পাকিস্তান ও জৈশে মোহাম্মদসহ নানা সন্ত্রাসী সংস্থার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। ভারত সরকার ক্রমাগত পাকিস্তানকে এ বিষয়ে উদ্যোগী হওয়ার পদক্ষেপ নিতে বললেও গৃহীত পদক্ষেপে সন্তষ্ট নয় ভারত। পাকিস্তানের জনগণ পূর্বাপেক্ষা সচেতন। পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি বলেছেন, সন্ত্রাসের উস্কানি আসে পাকিস্তান থেকেই। পাকিস্তানের শান্তিপ্রিয় জনগণ পাকসরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও সেখানে প্রতিবাদ প্রকাশের সুযোগ নেই। এ যাত্রায় ভারত কর্তৃক পাক জঙ্গি হত্যার পর পাকিস্তানে তদন্তের প্রস্তাব দিয়েছে। পাকিস্তান সরকার ভারতের এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। উপমহাদেশকে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসমুক্ত করতে হলে পারস্পরিক সমঝোতা, শান্তি ও সৌহার্দ্য প্রয়োজন। অসহিষ্ণুতা, অদূরদর্শিতা আর জঙ্গিবাদে ঝুঁকে পড়া ক্ষতি বয়ে আনবে এবং দক্ষিণ এশিয়াকে আরো অশান্ত করবে। সেজন্য জঙ্গিবাদ, যুদ্ধোন্মাদনা আর অসহিষ্ণুতার বিপরীতে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ-চীন-জাপানসহ দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্রগুলোকে। দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি, নিরাপত্তা, অগ্রগতি ও সুনাম নির্ভর করছে ভারত-পাকিস্তানের সুসম্পর্ক এবং যুদ্ধের উন্মাদনা থেকে সরে আসার শুভ উদ্যোগ গ্রহণের ওপর।
রতনতনু ঘোষ: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক


আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০