শিরোনাম

’ভারতের ত্রিপুরায় ফেন্সিডিল তৈরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে

তবুও থেমে নেই মাদক ব্যবসা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি : | সোমবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৬ | পড়া হয়েছে 545 বার

তবুও থেমে নেই মাদক ব্যবসা

যুবক কবির মিয়া মাদকাসক্ত। চাওয়া মাত্র নেশার জন্য টাকা না দিলে বাবা-মায়ের উপর হাত তুলতেও দ্বিধাবোধ করে না সে। ভাঙচুর চালায় বাড়িঘরে। উপায়ন্তু না দেখে কবিরের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে নালিশ দেন বাবা মন মিয়া। পুলিশ তাকে ধরে এনে ভ্রাম্যমাণ আদালতে তুলে দেয়। আদালত তাকে ছয় মাসের কারাদন্ড দেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় চলতি মাসের ৩ তারিখে ঘটে যাওয়া ঘটনা এটি। কবির মিয়ার বাড়ি উপজেলার টানুয়াপাড়া গ্রামে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের একটি নামীদামী স্কুলের মেয়েরাও নাকি ইয়াবায় আসক্ত। কয়েকমাস আগে একজন চিকিৎসক ও কমিটির সদস্যের এমন তথ্যে জেলা আইন শৃংখলা রক্ষা কমিটির সভায় তোলপাড় হয়। চিকিৎসক সভাকে জানান, তিনি ওই স্কুলের একাধিক শিক্ষার্থীর ইয়াবা আসক্তসংক্রান্ত চিকিৎসা করেছেন। এর পর থেকে ওই স্কুলের সন্দেহভাজন শিক্ষার্থীদের বইয়ের ব্যাগ চেক করে ক্লাশে ঢুকানো হয়।
ইয়াবাসহ ধরা পড়েছে পুলিশের এক সদস্য। গত ১ সেপ্টেম্বর মো. মান্নান নামে ওই পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে ২০০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর। ওই সময়ে আদালতে কর্মরত থাকা ওই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানায় মামলাও হয়। তবে বিভিন্ন কারণে বিষয়টি তখন চেপে যান সংশ্লিষ্টরা। ইয়াবার ছড়াছড়ি থাকা চকরিয়া উপজেলায় ওই পুলিশ সদস্য দীর্ঘদিন চাকরি করেন বলে জানা যায়।
মাদকের কারণে এমনই সামাজিক অবক্ষায় দেখা দেখা দিয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। এই যখন অবস্থা তখন মাদকের বিরুদ্ধে কড়া হুশিয়ারি উচ্চারণ করা হয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে। পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান তো বলে কয়ে ডাকাতের মতো মাদক ব্যবসায়িদের নির্মুল করার ঘোষণা দেন। আখাউড়ার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ি রহিজ উদ্দিন কসবায় কথিত ’বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরে মাদক বিরোধী সমাবেশ শেষে স্থানীয় জনতার সহায়তায় একাধিক মাদক ব্যবসায়ির ঘর গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আখাউড়ার উত্তর ও দক্ষিণ ইউনিয়নের দু’টি ইউনিয়নের জনগণের হাতে লাঠি বাঁশি রেখে পুলিশের সহযোগিতায় মাদক নির্মুলের চেষ্টা করা হচ্ছে। আইন শৃংখলা বাহিনীর হাতে আটক মাদকসেবি ও ব্যবসায়িদের প্রতিনিয়তই সাজা হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালতে।
এত কিছুর পরও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থেমে নেই মাদক ব্যবসা। জেলার সীমান্ত পথ দিয়ে প্রতিদিনই আসছে অনেক রকমের মাদক। জেলাজুড়ে রয়েছে বেশ কিছু মাদকের স্পট। মাদকের জাল ছড়িয়ে পড়েছে জেলার সর্বত্র। এ অবস্থায় বিশেষ করে যুব সমাজ আক্রান্ত হচ্ছে মরণ নেশা মাদকে।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর আখাউড়া থানার নতুন ভবন উদ্বোধন উপলেক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক। আলোচনা করতে গিয়ে তিনি মাদক নির্মূলে সবাইকে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ’আখাউড়া সীমান্ত এলাকা বিধায় পাশ্ববর্তী দেশ থেকে মাদক আসে। আদালত, পুলিশের মাধ্যমে মাদক নির্মূল করা যাবে না। আমাদের বিপুল জনগোষ্ঠীকে মাদক নির্মূলে এগিয়ে আসতে হবে। এ জন্য সোচ্চার হতে হবে, প্রতিবাদ করতে হবে, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে’।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে কসবা, আখাউড়া ও বিজয়নগর ভারত সীমান্ত ঘেঁষা। ওপারে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য। ওই রাজ্য থেকেই মূলত গাঁজা, ফেন্সিডিল, মদসহ বিভিন্ন মাদক পাচার হয়ে আসে। এখন নতুন করে যোগ হয়েছে ইয়াবা নামের মাদক, যা বাংলাদেশের অভ্যন্ত থেকেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আসে। বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে এসব মাদক ছড়িয়ে পড়ে দেশের সর্বত্র।
বিজিবি-বিএসএফ সীমান্ত সম্মেলন শেষে গত ২৫ সেপ্টেম্বর আখাউড়ায় বিজিবি কম্পানি সদরে সংবাদ সম্মেলনে মাদক পাচার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন কুমিল্লা সেক্টেরের উপ-মহাপরিচালক গাজী মো. আহসানুজ্জামান। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ’ভারতের ত্রিপুরায় ফেন্সিডিল তৈরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্তের ওপারে যেসব এলাকায় গাঁজা চাষ হতো সেগুলোতে অভিযান চালিয়ে বিলীন করে দেওয়া হয়েছে। মাদক পাচাররোধে বিজিবি-বিএসএফ কাজ করতে একমত। দেশের অভ্যন্তরেও মাদক পাচাররোধে তৎপর আছে বিজিবি’।
এদিকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র মতে, অন্তত ৬০-৭০ জন বড় মাদক ব্যবসায়ি সব কিছু নিয়ন্ত্রন করছে। এর মধ্যে সীমান্তবর্তী আখাউড়া ও বিজয়নগর উপজেলাতে কারবারির সংখ্যা বেশি। এছাড়া কসবা, আশুগঞ্জ, বাঞ্চারামপুরে রয়েছে বেশ কয়েকজন বড় মাদক ব্যবসায়ি। আগে মাদক হিসেবে ফেন্সিডিলের পাচার বেশি হলেও এখন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে ইয়াবা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আখাউড়ার মনিয়ন্দ, মোগড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা, বিজয়নগরের নলগড়িয়া, নোয়াবাদী এলাকা, কসবার গোপীনাথপুর ও বায়েক এলাকা দিয়ে মাদক প্রবেশ করে বেশি। এসব মাদকের মধ্যে রয়েছে, মদ, গাঁজা, ফেন্সিডিল, ইস্কপ ইত্যাদি।
আখাউড়ার মনিয়ন্দ, আজমপুর, নুরপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে রয়েছে একাধিক মাদকের স্পট। এসব স্পটে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থান থেকে মাদকসেবিরা আসে। মনিয়ন্দ ও নুরপুরে মাদক বিরোধী অভিযান চালাতে গিয়ে আইন শৃংখলাবাহিনী একাধিকবার তোপের মুখে পড়ে। বিজয়নগরের কাশিনগর গ্রামের অন্তত অর্ধশত বাড়িতে গাঁজা বিক্রি হয়। নলগড়িয়া সীমান্ত দিয়ে আসা গাঁজা রাখা হয় কাশিনগর গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে।
অবশ্য সীমান্ত এলাকার বেশির ভাগ স্থানে কাঁটাতারের বেড়া হওয়ায় এখন আর আগের মতো অবাধে মাদক প্রবেশ করতে পারে না। তবে চোরাচালানিরা এখন কৌশল বদল করে মাদক পাচার করে আনছে। ফেন্সিডিল ও ইস্কপ পাচারে তারা পাইপ ব্যবহার করছে। কাঁটাতারের বেড়ার একপ্রান্তে এসব মাদক ঢুকিয়ে দিয়ে অন্যপ্রান্তে দিয়ে এসব মাদক তারা বের করে আনছে।
ভারত থেকে পাচার হয়ে আসা এসব মাদক সড়ক, রেল ও জলপথ হয়ে পাচার হয়ে যায় দেশের বিভিন্নস্থানে। ’লাইম্যান’ হিসেবে পরিচিত এক শ্রেণির লোক এসব মাদক পাচারে সহযোগিতা করে থাকে। আইন শৃংখলাবাহিনী ম্যানেজের দায়িত্বে তারা আছে- এমন কথা বলে পাচারকারিদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে থাকে লাইনম্যানরা। পাচারকাজে এক ধরণের বিশেষ টোকেনও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। পাচারের সুবিধার্থে এ কাজে নারীদেরকে ব্যবহার করা হয় বেশি। তারা বিশেষ পোশাক পরে ও বিশেষ স্থানে রেখে মাদক পাচার করে থাকে।
আখাউড়ায় মাদক বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা সৈয়দ তানভীর শাহ মন বলেন, ’মাদক ব্যবসায়িরা বেপরোয়া। গত কয়েকদিন আগে তারাগন গ্রামে মাদক বিরোধী সভায় এক মাদক ব্যবসায়ি উপস্থিত হয়ে তার কিছু মাদক আমাদের কমিটির লোকজন রেখে দেয় বলে অভিযোগ করে। ওই মাদক ব্যবসায়ি প্রকাশ্যে এমন কথা বলার বিষয়টি জেনেও পুলিশ তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় নি। ওই মাদক ব্যবসায়ির এমন দু:সাহস সভায় উপস্থিত অনেককেই হতবম্ব করে’।
কসবা থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিউদ্দিন বলেন, ’১০-১২ জন কারবারি এখানকার মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রন করে। তবে আখাউড়ার রহিজ উদ্দিন ’বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার পর এসব ব্যবসায়িরা গা ঢাকা দিয়েছে। মাদক ব্যবসায়িদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে’।
আখাউড়া থানার ওসি মো. মোশারফ হোসেন বলেন, ’মাদক প্রতিরোধে দু’টি এলাকায় লাঠি-বাঁশির কর্মসূচি নিয়ে সফলতা পাওয়া গেছে। ওইসব এলাকায় মাদকসেবিরা বিশেষ করে জেলা শহর থেকে মোটর সাইকেলে করে যারা আসত তারা এখন সাহস পায় না। যে কারণে অনেকটাই নিয়ন্ত্রনে ওই এলাকাগুলোর মাদক ব্যবসা। তবে মাদকসেবিরা দিক পরিবর্তন করে এখন মনিয়ন্দ এলাকায় চলে যায়। আমরা ধীরে ধীরে সবকিছু নিয়ন্ত্রনে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছি’।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পরিদর্শক দেওয়ান মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ’গত কয়েক মাসের পরিসংখ্যান দেখলে বুঝা যাবে যে, আগের চেয়ে এখন আমরা অনেক বেশি তৎপর। প্রতি মাসেই আমরা গড়ে অন্তত ১৫টি মামলা করছি’। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ’এখন ইয়াবার দিকেই ঝুঁকছে মাদক সেবিরা। অভিযানে ইয়াবাই বেশি উদ্ধার হচ্ছে’।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ’কিছু উদ্যোগের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরে মাদক অনেকটা নিয়ন্ত্রনে। তবে এখন বিভিন্ন জায়গায় ইয়াবা ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা চেষ্টা করছি জেলার প্রতিটি এলাকাকে মাদকমুক্ত রাখার জন্য। এ বিষয়ে আমরা খুবই আশাবাদী’।


আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০