শিরোনাম

জালিয়াতি করে সরকারি চাকরি!

স্টাফ রিপোর্টার : | শনিবার, ২৪ মার্চ ২০১৮ | পড়া হয়েছে 348 বার

জালিয়াতি করে সরকারি চাকরি!

জালিয়াতির মাধ্যমে স্থায়ী ঠিকানা গোপন করে কৌশলে গত ৪ মাস আগে সরকারি চাকুরী বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে সুলতানা রাজিয়ার বিরুদ্ধে। জাতীয় পরিচয়পত্র রেখেও তিনি দুই উপজেলায় করেছেন ২টি জন্ম নিবন্ধন। জেলার কসবা পৌর এলাকার শাহপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা রাজিয়া। আর জালিয়াতির মাধ্যমে সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের রাজামারিয়া কান্দি গ্রামের স্থায়ী নাগরিক সেজে চাকুরি নিয়েছেন। তার প্রতারণা ও জালিয়াতির কারণে ওই পদে চাকুরি বঞ্ছিত হয়েছেন সরাইল উপজেলার একজন নাগরিক। তবে রাজিয়ার ব্যাংক হিসাবে ব্যবহৃত ঠিকানার তথ্য দিতে সরাসরি অপারগতা প্রকাশ করেছেন জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মানবেন্দ্র চক্রবর্তী। রাজিয়ার এমন জালিয়াতিতে অবাক হয়েছেন শাহবাজপুরবাসী। গোটা সরাইলে এ বিষয়ে চলছে নানা আলোচনা। আর সব কিছু জেনেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একেবারেই নিরব।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৬ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক পদে নিযোগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। ওই বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে লিখা ছিল শুন্য বা সৃষ্ট পদ না থাকায় কসবা উপজেলার প্রার্থীদের আবেদন করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু কসবার রাজিয়ার চিন্তা হল যেকোন উপায়ে আবেদন করতেই হবে। তাই রাজিয়া স্থায়ী ঠিকানায় জালিয়াতি করেছেন। প্রকৃত স্থায়ী ঠিকানা গোপন করে রাতারাতি সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের রাজাবাড়িয়া কান্দি গ্রামের স্থায়ী নাগরিক সেজে তৈরী করেছেন জন্ম নিবন্ধন (নং-১৯৯৫১২১৯৪৮৫১০৬৩২৫)। জাতীয় পরিচয় পত্র ছাড়াই আবেদন করেছেন রাজিয়া। অথচ ওই গ্রামে মহিউদ্দিন আহমেদ বা তার মেয়ে সুলতানা রাজিয়া নামের কেউ নেই। এ নামের কেউ ওই গ্রামে কোন সময় স্থায়ীভাবে বসবাসও করেননি। এমনকি ভোটার তালিকায় এমন নাম নেই। সার্ভিস বুকেও তিনি শাহবাজপুরের ঠিকানাই লিপিবদ্ধ করেছেন। সরাইলের কোটায় চাকুরি নেওয়ার জন্যই রাজিয়া এই অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করেছেন। আর তখন সহকারি শিক্ষক পদে সরাইল উপজেলায় নিয়োগ পেয়েছেন ২ জন। তাদের একজন কসবা উপজেলার সুলতানা রাজিয়া। রাজিয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সহ সকলের চোখকে ফাঁকি দিয়ে ২০১৭ সালের ৬ নভেম্বর সরাইল উপজেলা শিক্ষা অফিসে যোগদান করেন। তাকে পোষ্টিং দেওয়া হয় শাহজাদাপুর উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। গত ৫ মাস ধরে বহাল তবিয়তেই চাকুরী করছেন রাজিয়া। আর বঞ্ছিত হয়েছেন সরাইলের একজন চাকুরী প্রার্থী। যোগদানের পর সরাইল জনতা ব্যাংকে হিসাব খুলতে যান রাজিয়া। আইডি কার্ডের জটিলতায় প্রথমে একটু সমস্যা হলেও পরে যে কোন উপায়ে শুধু জন্ম নিবন্ধন দিয়েই হিসাব খুলে দিয়েছেন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। সঞ্চয়ী হিসাব নং- ১০০১১৬৫৪৯৪৬২ এর মাধ্যমে সরকারি বেতনও উত্তোলন করেছেন। উচ্চ মাধ্যমিক পাস রাজিয়ার জাতীয় পরিচয় পত্রটিও কসবার শাহপুরের (কোড নং- ৩৪৬০)। এনআইডি নং- ১৯৯৫১২২৬৩০১০০০০০৩। শাহপুর (১ম অংশ) ওয়ার্ডের ৭২২ ক্রমিক নাম্বারধারী ভোটার রাজিয়া। শাহপুরে জন্ম নিবন্ধন নং- ১২১১৩৫০০০২৫৩। আর সরাইলের শাহবাজপুর এলাকার জন্ম নিবন্ধন নং-১৯৯৫১২১৯৪৮৫১০৬৩২৫। একই ব্যক্তির দুটি জন্ম নিবন্ধনই জালিয়াতির স্বাক্ষী। শাহবাজপুর ৯নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোঃ এলেক মিয়া বলেন, রাহাত আলী, মহিউদ্দিন , সুলতানা রাজিয়া এরা কেউ আমার ওয়ার্ডের বাসিন্দা বা নাগরিক না। ভোটারও না। ইউপি চেয়ারম্যান রাজিব আহমেদ রাজ্জি বলেন, এটা শতভাগ জালিয়াতি। প্রতারণাও বটে। তৎকালীন চেয়ারম্যানের অসুস্থতার সুযোগে অফিসকে ম্যানেজ করেই হয়ত বা জন্ম নিবন্ধনটা নিয়ে গেছে। এটা খুবই গর্হিত কাজ। আমি সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে রাজিয়ার নিয়োগ বাতিলের দাবি জানাচ্ছি।


সরেজমিনে কসবার শাহপুর এলাকায় গিয়ে জানা যায়, গ্রামের প্রথম অংশেই রাজিয়াদের বাড়ি। রাজিয়ার দাদার নাম রাহাত আলী ভূঁইয়া। তাদের বসতবাড়ি কসবা উপজেলার পৌর শহরের শাহপুর ভূঁইয়া বাড়ি এলাকায়। পিতা- মহিউদ্দিন আহমেদ ওরফে নাবালক। তিনি ২০১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেছেন। রাজিয়ার ৩ চাচা। এরা হলেন- শাহাজাহান, জাহাঙ্গীর ও দুলাল। মাতা- মরিয়ম বেগম। রাজিয়ার জন্ম ১৯৯৫ সালের ১৪ জুলাই তারিখে। রাজিয়ার ৫ ভাই। বড় ভাইয়ের পেশা গৃহস্থি। একজন প্রবাসে। শাহপুর কমিউনিটি ক্লিনিকে কমিউনিটি হেলথ প্রোপাইটর পদে চাকুরী করছেন রাজিয়ার আপন ছোট ভাই আবু হানিফ। আরেকজন বিজিবিতে চাকুরী করছেন। আর সবার ছোট ভাই পড়া লেখা করছে। শাহপুর এলাকায়ই বড় হয়েছেন রাজিয়া। পড়া লেখাও করেছেন সেখানেই। শাহপুর আফছার উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবসা শিক্ষা শাখা থেকে ২০১১ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহন করে জিপিএ-৪.০১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। আর ২০১৪ সালে কসবা টি আলী কলেজের একই শাখা থেকে অংশগ্রহন করে জিপিএ-৩.০০ পেয়ে উত্তীর্ণ হয় রাজিয়া। বর্তমানে রাজিয়া কসবা টি আলী কলেজের একাউন্টিং বিষয়ে অনার্স শ্রেণির তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। কসবায় ক্লাশ আর সরাইলে চাকুরী একই সাথে চলছে দুইকাজ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শাহপুর গ্রামের একাধিক ব্যক্তি বলেন, রাজিয়ার দাদা বাবা চাচার বাড়ি তো এ গ্রামেই। রাজিয়াও তো প্রাথমিক থেকে কলেজ পর্যন্ত কসবায় পড়েছে। এখনো পড়ছে। সরাইলে নাকি একটা চাকুরী হয়েছে। গত ৪-৫ মাস ধরে রাজিয়াকে শাহপুরে মাঝে মধ্যে দেখা যায়। রাজিয়ার ভাই আবু হানিফ তো কসবায় কমিউনিটি ক্লিনিকে সরকারি চাকুরী করে। এই গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা না হলে এ চাকুরী পেল কিভাবে? রাজিয়া সরাইলের আর আপন ভাই হানিফ কসবার নাগরিক? এ খেলা তো আর বুঝলাম না। গত বুধবার সকালে শাহজাদাপুর উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় রাজিয়া পাঠদানে ব্যস্ত। সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়েই রাজিয়া মুখ ঘুরিয়ে জানালার কাছে চলে যায়। পরে সুলতানা রাজিয়া অকপটে তার দাদাসহ গোটা পরিবার কসবায় স্থায়ীভাবে বাস করছে ও তিনি কসবায় পড়েছেন এবং পড়ছেন এ কথা স্বীকার করে বলেন, আমার আব্বা অনেক আগে শাহবাজপুর রাজাবাড়িয়াকান্দি গ্রামে বাড়ি করেছেন। এ জন্য এখান থেকে আবেদন করেছি। ২১ বছর বয়সে কসবার আইডি কার্ড রেখেও ২০১৬ সালে শাহবাজপুর থেকে কেন জন্ম নিবন্ধন নিয়েছেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে নিরব থাকেন রাজিয়া। তবে কিছুটা ঝামেলার পর সালে জানুয়ারী মাসে এনআইডি কার্ড ছাড়াই সরাইল জনতা ব্যাংকে হিসাব খুলে হাফ ছাড়ার কথা স্বীকার করে রাজিয়া বলেন, আমি এই পর্যন্ত ৪ মাসের বেতন উত্তোলন করেছি। রাজিয়ার ব্যাংক হিসাবে দেওয়া ঠিকানা সম্পর্কে জানতে গেলে ব্যবস্থাপক মানবেন্দ্র চক্রবর্তী প্রতিবেদককে বলেন, অনেক সাংবাদিক আসেন। এই সম্পাদক, সেই সম্পাদক বলেন। ওই শিক্ষিাকার হিসাবে ব্যবহৃত ঠিকানা সম্পর্কে আপনাকে বলা যাবে না। এটা কেবল দুদকের লোকজন জানতে চাইলে দেখাতে পারি। অন্য কেউ না। আপনি অফিস থেকে পত্র নিয়ে আসেন। দেখব কি করা যায়?

সরাইল উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে নিয়োগদানকারী হিসাবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ব্যবস্থা নিবেন। তবে তথ্য জালিয়াতি প্রমাণিত হলে ওই শিক্ষক বরখাস্থ হতে পারে। এ বিষয়ে মুঠোফোনে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সুব্রত কুমার বণিক বলেন, নিয়োগ পত্রের শর্তে উল্লেখ রয়েছে কোন ধরণের ভূয়া বা জালিয়াতি প্রমাণিত হলে স্বয়ংক্রিয় ভাবে অথবা আইনানুগ পক্রিয়ায় চাকুরী বাতিল হয়ে যেতে পারে। তদন্ত চলছে। প্রমাণিত হলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০