[count_down]

শিরোনাম

চর সোনারামপুর ॥ সুবিধাবঞ্চিত এক বিছিন্ন জনপদ ॥ বাতির নিচে অন্ধকার

শামীম-উন-বাছির | সোমবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | পড়া হয়েছে 193 বার

চর সোনারামপুর ॥ সুবিধাবঞ্চিত এক বিছিন্ন জনপদ ॥ বাতির নিচে অন্ধকার

চারিদিকে থৈ থৈ পানি। মাঝে জেগে উঠা এক চরের নাম সোনারামপুর। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলার মেঘনা নদীর মাঝখানে জেগে উঠা সোনারামপুর চর। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এই চরের বাসিন্দারা আধুনিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। প্রায় ৪ হাজার মানুষ বসবাস করে এই চরে। এদের মধ্যে ভোটার প্রায় দেড় হাজার।

সোনারামপুর চর আশুগঞ্জ সদর ইউনিয়নের অংশ হলেও সকল দিক থেকেই পিছিয়ে আছে এই চরের বাসিন্দারা।
মাছ ধরা এই চরের মানুষের প্রধান পেশা হলেও অনেকেই আশুগঞ্জের ধানের মোকামসহ বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকের কাজ করে। মহিলারা কেউ কেউ ফেরী করে মুড়ি বিক্রি করেন। আবার অনেকেই বর্তমানে আশুগঞ্জ বাজারে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে জড়িয়েছেন।
সরকারী উদ্যোগে এখানে একটি বিনোদন কেন্দ্র নির্মান করা হলে সরকারের রাজস্ব বাড়াসহ চরের বাসিন্দাদের জীবন যাত্রার মান বেড়ে যাবে বলে মনে করেন এখানকার মানুষজন।

সোনারামপুর হঠাৎ করে জেগে উঠা কোন চর নয়। শত বছরের ইতিহাস আছে চরটির। এর আয়তন প্রায় ২ বর্গ কিলোমিটার।
চরের বাসিন্দা রায়মন চন্দ্র দাস জানান, প্রায় ৭০/৮০বছর পূর্বে বৃটিশ নাগরিক মেরকাডিং প্রথম এই চরে একটি পাটের গুদাম নির্মান করে এখানে ব্যবসা শুরু করেন। পরে তিনি চরে একটি বিনোদন কেন্দ্র তৈরী করেন। বৃটিশ শাসনের পর সিলেটের ভানু গাছের হাজী কেরামত আলী চরটি কিনে নেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এই চরে মানুষ আসতে শুরু করেন।


রায়মন চন্দ্র দাস জানান, তিনি প্রায় ৪০ বছর আগে এই চরে এসে বসতি গড়েছেন। মেঘনা নদীতে নৌকা চালিয়েই তার ছয় সদস্যের পরিবার চলে। তিনি বলেন, চরের বাসিন্দাদের প্রধান পেশা মাছ ধরা হলেও অনেকেই আশুগঞ্জের ধানের মোকামসহ বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকের কাজ করেন। আবার কেউ কেউ আশুগঞ্জ বাজারে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে জড়িত।

চরের প্রবীন বাসিন্দা সুধীর বর্মন বলেন, প্রথমে তারা ৩/৪ টি পরিবার চরে এসে বসবাস শুরু করেন। পরে তাদের চেষ্টায় ৮০ দশকে উপজেলার লালপুর, হবিগঞ্জ উপজেলার ছাতিয়ান, কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর, বাজিতপুর এবং ভৈরব থেকে কিছু দরিদ্র ও ভাসমান জেলে পরিবার চরে এসে বসবাস শুরু করেন।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, চরের বাসিন্দারা আধুনিক সকল সুযোগ সুবিধে থেকে বঞ্চিত। চরে প্রায় ৪ হাজার মানুষ বসবাস করলেই চরে কোন বিদ্যুৎ নেই, তবে কয়েক বছর আগে চরে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাও পর্যাপ্ত নয়। তিনি বলেন, চরে রয়েছে বিশুদ্ধ পানিরও সংকট। নৌকা ছাড়া চরের বাসিন্দাদের যোগাযোগের কোন ব্যবস্থা নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯১ সালে চরে একটি বে-সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। যা বর্তমানে সরকারিকরণ করা হয়েছে। তবে যাতায়ত ভোগান্তির কারনেই চরের অনেক শিক্ষার্থীই প্রাথমিক শিক্ষা শেষে উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করতে পারেনা।
চরের বাসিন্দাদের মধ্যে অধিকাংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের হলেও এখানে বেশকিছু মুসলমান পরিবার বসবাস করে। একই সীমানায় রয়েছে হযরত শাহ সৈয়দ নাহিদুল ইসলাম (রহঃ)এর মাজার এবং শ্রী রাধা গোবিন্দের মন্দির।

চরসোনারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী জয়া রাণী বর্মণ জানায়, দিনের বেলা খুব একটা সমস্যা না হলেও সন্ধ্যায় পড়তে গেলে কষ্ট করতে হয়। চার্জ না থাকার কারণে অধিকাংশ সময়ে সৌর বিদ্যুতের আলো না পেয়ে কুপি অথবা মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়তে হয় তাকে। জয়া রানী দ্রুত চরে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার দাবি জানিয়েছে।

শোভা রাণী নামে চরের এক বৃদ্ধা জানান, গরমের দিনে ঘরের ভেতরে থাকতে পারিনা। তখন দিনের বেশিরভাগ সময় ঘরের বাইরে বসে থাকি। বাতাসের জন্য সারা বাড়িতে গাছপালা লাগিয়েছি। তিনি বলেন, আশুগঞ্জে উৎপাদিত বিদ্যুত সারা দেশে আলো ছড়ায় অথচ আমরা বঞ্চিত। তিনি এই চরে বিদ্যুৎ দেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।

এ ব্যাপারে আশুগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আল-মামুন বলেন, সরকারী উদ্যোগে চরে যদি একটি বিনোদন কেন্দ্র নির্মান করা হয় তাহলে সরকারের রাজস্ব বাড়াসহ চরের বাসিন্দাদের জীবন যাত্রার মান বৃদ্ধি পাবে।

এ ব্যাপারে আশুগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ সালাহউদ্দিন বলেন, তিনি চেয়ারম্যান হওয়ার পর চরের বাসিন্দাদের জন্য অনেক কাজ করেছেন। তিনি জানান, চরের বাসিন্দাদের চলাফেরা করার জন্য তিনটি রাস্তা, পানি নিষ্কাষনের জন্য পাইপ লাইন নির্মান করেছেন। তিনি বলেন, চরে প্রায় ২৫টি সোলার লাইট লাগানো হয়েছে। বিশুদ্ধ পানির জন্য প্রায় ১২টি আর্সেনিকমুক্ত টিউবওয়েল বসানো হয়েছে। চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন আরো বলেন, চরে বিদ্যুৎ না থাকার কারনে আশুগঞ্জ উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুতায়ন উপজেলা বলা যাচ্ছেনা। তবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ নাজিমুল হায়দার বলেন, চরে সরকারি ও বেসরকারিভাবে সোলার দেয়া হয়েছে। তবে মূল বিদ্যুৎ সংযোগ এখনও দেয়া হয়নি। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহের কার্যক্রম চলমান আছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আশুগঞ্জ বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রিয়াজুল হক বলেন, কোন পদ্ধতিতে চরসোনারামপুরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে- সেটি একটি ফ্যাক্টর ছিল। তবে ইতোমধ্যে চরসোনারামপুরসহ দেশের তিনটি চর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিদুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে আমাদের বিতরণ বিভাগ থেকে প্রজেক্ট আকারে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। ওই প্রজেক্ট অনুমোদন পেলেই বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রক্রিয়া শুরু হবে।

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১