শিরোনাম

খোলা চিঠি দিলাম তোমার কাছে

| বৃহস্পতিবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | পড়া হয়েছে 621 বার

খোলা চিঠি দিলাম তোমার কাছে

শরৎ বাবু/ খোলা চিঠি দিলাম তোমার কাছে/ তোমার গফুর মহেশ এখন কোথায় কেমন আছে/ তুমি জান না…। ভূপেন হাজারিকার মিষ্টি গলার এই গানটি আমরা অনেকেই শুনেছি, মুগ্ধ হয়েছি। শরত্চন্দ্রের অমর গল্প মহেশের চরিত্রগুলো আমাদের খুব কাছের মনে হয়। এ জন্যই গানটির আবেদন এত বেশি। শুধু সুরের জন্য নয়, গানটি বেশি ভালো লাগে তার পেছনের গল্পটির জন্য।
সম্প্রতি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়াকে একটা খোলা চিঠি দিয়েছেন। এই চিঠির পেছনে অবশ্য কোনো হৃদয়ছোঁয়া গল্প নেই। আছে নিরেট বাস্তবতা। তা সত্ত্বেও এই চিঠি রাজনীতির নিস্তরঙ্গ জলে কিছুটা ঢেউ তুলেছে। এটাই জাফরুল্লাহর প্রথম চিঠি নয়। কয়েক সপ্তাহ আগে তাঁর আরেকটি পত্রাঘাত দেখেছিলাম আমরা। তখন তিনি বেগম জিয়াকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ছাড়তে অনুরোধ করেছিলেন। বেগম জিয়া অবশ্য ওই চিঠির জবাব দেননি। জবাব দিয়েছিলেন বিএনপির কয়েকজন নেতা এবং জামায়াত। একই প্রসঙ্গ টেনে বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ একই রকম পরামর্শ দিয়েছিলেন। অধ্যাপক এমাজউদ্দীন বিএনপি বলয়ের শত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক। পরামর্শ তিনি দিতেই পারেন।
ডা. জাফরুল্লাহর আনুষ্ঠানিক কোনো দলীয় পরিচয় নেই। কিন্তু বিএনপির প্রতি তাঁর দুর্বলতা কিংবা পক্ষপাত কোনো গোপন বিষয় নয়। বিএনপি তাঁর পছন্দের দল। এই দলটা নিয়ে তিনি ভাবেন। দেশে রাজনৈতিক দলের অভাব নেই। তিনি সাম্যবাদী দল কিংবা কল্যাণ পার্টিকে পরামর্শ দিতে যাননি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে সুশাসন ও উন্নয়ন-কৌশল নিয়ে নানান সমালোচনা থাকলেও আওয়ামী লীগকেও তিনি কোনো উপদেশ খয়রাত করেননি। পরামর্শের পাত্রী হিসেবে তিনি বেগম জিয়াকেই বেছে নিয়েছেন। এ থেকে একটা সরল উপসংহার টানা যায়—তিনি বিএনপির ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। মনে করেন, এই দলটির এখনো ভবিষ্যৎ আছে, তার ঘুরে দাঁড়ানো দরকার। এবং এ জন্য তার কী কী করা দরকার তা নিয়ে তিনি দু-চার কথা বলেছেন।
চিঠিটি তিনি নিজেই লিখেছেন কি না, জানি না। লেখায় কিছু তথ্যগত বিভ্রাট আছে, চপলতাও আছে। এগুলো না থাকলেই ভালো হতো। যেহেতু খোলা চিঠি, এটাকে নেহাত ব্যক্তিগত বলা যাবে না। তিনি এটা গণমাধ্যমেও দিয়েছেন। জন আলোচনায় একান্ত আটপৌরে বিষয়গুলো না আনাই ভালো।
চিঠির শুরুতেই আছে জন্মদিন প্রসঙ্গ। ১৫ আগস্ট শোকের দিনে জন্মদিন পালন না করার জন্য বেগম জিয়াকে সাধুবাদ জানিয়ে এটাকে তিনি একটা ভালো কাজ বলেছেন। ডা. জাফরুল্লাহর মতে, বেগম জিয়া এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দেখিয়েছেন। বিষয়টা এখানেই শেষ হলে ভালো হতো। বেগম জিয়া চুপ থাকলে কী হবে, তার পারিষদেরা তো চুপচাপ বসে থাকার লোক নন! ১৫ আগস্টের ঘটনার জন্য শোক কিংবা জাতির জনকের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা—এ জন্য জন্মদিনের অনুষ্ঠান করা হলো না, এ কথাটা যাতে কেউ বিশ্বাস না করে, সে জন্য দলীয় কিছু নেতা বন্যা, সন্ত্রাস ইত্যাদি কারণকে উপলক্ষ করেছেন। ফলে জাফরুল্লাহর ভাষায় বেগম জিয়ার বুদ্ধিমত্তা বা রাজনৈতিক প্রজ্ঞা মাঠে মারা গেছে। এ দেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সহজাতভাবেই ছিদ্রান্বেষী। ভালো কাজের মধ্যেও তারা বদ মতলব খোঁজে। বিএনপির নেতারা জন্মদিন পালন না করার ব্যাখ্যা দিতে ব্যস্ত না হলে বিষয়টা হয়তো এখানেই চাপা পড়ত, অথবা কেউ এ নিয়ে প্রশ্ন তুললে সাধারণ মানুষ তা পাত্তা দিত না। কিন্তু সেটা হওয়ার নয়।
এ প্রসঙ্গে আরেকটা কথা মনে পড়ল। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের রায় প্রকাশিত হওয়ার পর বিএনপি আওয়ামী লীগ সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিল। কিন্তু সরকার যখন এটাকে সমুদ্রজয় হিসেবে দেখানো শুরু করল, বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ প্রত্যাহার করে নিল। এটা ছিল বছরের সেরা মশকরা। প্রতিপক্ষের কাছে ভালো কাজের স্বীকৃতি নেই।
বিএনপি বেশ সংকটে আছে। ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে দলটি ব্যাকফুটে চলে গেছে। দলের মধ্যে সৎ লোকের সংখ্যা হাতে গোনা। নগদজীবীদেরই উপচে পড়া ভিড়। দীর্ঘকাল ক্ষমতার বাইরে থাকতে অনভ্যস্ত এ রকম একটি দলে দর্শন তো দূরের কথা, ন্যূনতম শৃঙ্খলা বজায় রাখাও কষ্টকর। দলটি আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে আগ্রহী। সে জন্য যে সাংগঠনিক সামর্থ্য দরকার, তার ঘাটতি আছে বিএনপিতে। ডা. জাফরুল্লাহ এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বেগম জিয়াকে বলেছেন, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ আরও বাড়াতে হবে, তাঁদের আরও সময় দিতে হবে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বেগম জিয়া যখন আদালতে কিংবা স্বামীর কবর জিয়ারত করতে যান, তখন নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি ও ঠেলাঠেলি চোখে পড়ার মতো। এর বাইরে তাঁর গণসংযোগ তেমন নেই।
দলের কমিটিগুলো নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। দলের ভেতরে গণতন্ত্রের চর্চা বাড়াতে পরামর্শ দিয়েছেন। দলের বিভিন্ন পর্যায়ে নারীর প্রতিনিধিত্ব দৃষ্টিকটুভাবে কম বলে আক্ষেপ করেছেন।
এ সবই ভালো পরামর্শ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এটা সবারই জানা, দল করলে দলের ভেতরে থেকে এসব কথা উচ্চারণ করা মহাপাপ। জাফরুল্লাহ দলের কোনো পদে নেই বলে অনায়াসে এসব বলতে পারছেন। তাঁর কথায় দলের অনেক নেতা-কর্মীর মনের ভাবের প্রতিধ্বনি আছে। তবে একটা কথা মাঝেমধ্যে শোনা যায়—দলে বেশি গণতন্ত্র থাকলে নাকি দল টেকে না। গণতন্ত্রের অবয়বটা সব দলেই মোটামুটি একই রকম। একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবারকে আশ্রয় করেই এ দেশে রাজনীতির ব্যাকরণ তৈরি হয়ে গেছে। শিগগিরই এ থেকে মুক্তির উপায় নেই। জাফরুল্লাহ বেগম জিয়ার পুত্রবধূকে দলের স্থায়ী কমিটিতে না রাখায় অনুযোগ করেছেন। পরিবারতন্ত্রের প্রতি জাফরুল্লাহর এই আস্থা দেখে তাঁর সম্পর্কে আমার পূর্বধারণা হোঁচট খেয়েছে। তিনি আমার পছন্দের মানুষদের একজন বলেই এ কথা বলছি।
বিএনপি বরাবরই রাজনীতিতে ভারত কার্ড ব্যবহার করে এসেছে। এতে ফলও পেয়েছে। ভারতকে কষে দুটি গাল দিলে কোনো কাজ না করেও ভোট বেশি পাওয়া যায়, বিএনপির এই উপলব্ধি অনেক দিনের। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর বিএনপির হুঁশ হলো, ভারত তো আজীবন ভারতেই থাকবে, সরানো যাবে না! তার সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকাটা অতি জরুরি। তখন বিএনপির কৌশলে কিছু পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। যে কারণেই হোক, বিএনপি তার আচরণে ওই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে যাঁরা কট্টরপন্থী, তাঁদের সঙ্গে জাফরুল্লাহ সুর মিলিয়েছেন। হয়তো তিনি নিজ বিশ্বাস থেকেই কথাটি বলেছেন। ভারতবিরোধী একটা জোরালো অবস্থান নেওয়ার জন্য তাগিদ দিয়েছেন তিনি। এটা তিনি বিএনপিকে ভাসানোর জন্য না ডোবানোর জন্য বলেছেন, তা দেখার জন্য আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।
বিএনপিকে এখন যাঁরা পরামর্শ দেন, তাঁদের অনেকের ওপর হয়তো জাফরুল্লাহর আস্থা নেই। তিনি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিস্থানীয় বেশ কয়েকজনের নাম প্রস্তাব করেছেন, যাঁদের পরামর্শক বা উপদেষ্টা হিসেবে বিএনপি বিবেচনা করতে পারে। বিএনপির প্রতি তাঁদের কারও কারও পক্ষপাত আছে। আবার বেশ কয়েকজন একেবারেই নির্দলীয়। তাঁদের নাম প্রস্তাব করে তিনি কি তাঁদের একটা বিব্রতকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিলেন না? তাঁরা অবশ্য এখনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। হয়তো পরামর্শটা মনে ধরেছে, অথবা গুরুত্বহীন বলে হয়তো উপেক্ষা করেছেন।
ডা. জাফরুল্লাহর কিছু পরামর্শ মনে হয়েছে সর্বজনীন। সরকারও বিষয়গুলো বিবেচনা করে দেখতে পারে। বিশেষ করে জনগণের সনদ উপশিরোনামে তিনি যে কথাগুলো বলেছেন। যেমন—সামরিক বাহিনীর দরে দরিদ্র মানুষকে রেশন–সুবিধা দেওয়া, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য তৃণমূল পর্যায়ে প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া, ইউনিয়ন পর্যায়ে চিকিৎসা-সুবিধা বাড়ানো, পাঠ্যবইয়ে বীর নারীদের কাহিনি অন্তর্ভুক্ত করা, নিয়মিত ছাত্রসংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা এবং প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়া। তিনি অনেকগুলো প্রদেশ করার কথাও বলেছেন। এগুলো খুবই সময়োচিত ও জরুরি বিষয় এবং এসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া দরকার। বিশেষ করে আমলাতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ না করে রাজনৈতিক কাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণের প্রস্তাবটির দিকে সবার নজর দেওয়া দরকার।
পরামর্শগুলো দিয়েছেন তিনি বেগম জিয়াকে। বেগম জিয়া এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে মুখ খোলেননি। জবাব দেওয়ারই বা কী দরকার। গ্রহণযোগ্য হলে তিনি তাঁর দলীয় গঠনতন্ত্র ও কর্মসূচিতে এসব ঢোকাবেন। তা না হলে এ চিঠি বেয়ারিং হিসেবেই পড়ে থাকবে। তবে একটি পরামর্শ তিনি অবশ্য মেনে নিয়েছেন, কার্যকর করেছেন সঙ্গে সঙ্গেই। রামপাল থেকে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সরিয়ে নিতে বলেছেন। এ নিয়ে জল আরও ঘোলা হলো।

মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক।


আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১