শিরোনাম

কর্মস্থলে যৌনতা

বিশেষ প্রতিনিধি : | মঙ্গলবার, ২৭ মার্চ ২০১৮ | পড়া হয়েছে 150 বার

কর্মস্থলে যৌনতা

আবছা আলো জ্বলছিল ঘরে। পানীয়ের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিলেন অফিসের বড় কর্তা একটি আরামকেদারায় বসে। তাঁর সামনে বসে আছেন সদ্য চাকরি পাওয়া এক তরুণী। মাত্রই কর্মজীবন শুরু করেছেন তিনি। হুট করেই বড় কর্তা বলে উঠলেন, ‘চাইলে যেকোনো নারীকেই আমি পেতে পারি। এখন আমি তোমাকে চাই।’ এ যেন এক নতুন হার্ভি ওয়াইনস্টিন। আর তাঁর সামনে বসা তরুণীটি হাজারো নিপীড়িত নারীর প্রতিনিধি। যৌন নির্যাতনের এমন ঘটনা এখন হরহামেশাই শোনা যাচ্ছে। গত বছরের অক্টোবরে হলিউডের প্রযোজক হার্ভির বিরুদ্ধে অনেক প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রী মুখ খোলার পর থেকেই সারা বিশ্বে #মিটু (#গবঞড়ড়)-এর জোয়ার শুরু হয়েছে। দেশে দেশে নিপীড়িত নারীরা মুখ খুলতে শুরু করেছেন। এসব যৌন নিপীড়নের সিংহভাগই সংঘটিত হয়েছে কর্মস্থলে।

ভারতে কর্মস্থলে যৌন হয়রানির চিত্র কেমন, তা জানতে ভারতীয় ম্যাগাজিন ইন্ডিয়া টুডে জরিপ চালিয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে এই জরিপ চালানো হয়। এই জরিপের মূল বিষয় ছিল ‘কর্মস্থলে যৌনতা’। ‘২০১৮ ইন্ডিয়া টুডে-এমআরডিএ সেক্স সার্ভে অ্যাট দ্য ওয়ার্কপ্লেস’ শীর্ষক এ জরিপে যৌন সম্পর্কের আরও নানা বিষয় নিয়ে তত্ত্ব-তালাশ চলে।


জরিপে অংশ নেওয়া পুরুষদের ৩৩ শতাংশ সহকর্মীর সাথে যৌন সম্পর্কে জড়ানোর কথা স্বীকার করেছেন। এসব পুরুষের অর্ধেকের বেশি অধস্তন কর্মীদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। অন্যদিকে, জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের ২২ শতাংশ তাঁদের সহকর্মীর সাথে যৌন সম্পর্কে জড়ানোর কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি নারী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা বসের সাথে যৌন সম্পর্কে জড়িয়েছেন।

ইন্ডিয়া টুডের প্রধান সম্পাদক অরুণ পুরি বলেছেন, জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, কর্মস্থলে যৌন সম্পর্কের ঘটনা ঘটছে। তবে এর বিরোধিতাও রয়েছে।

জরিপে দেখা গেছে, সহকর্মীর সাথে যৌনতাকে সমর্থন করেন না ভারতের ৬২ শতাংশ নারী। আর নারী-পুরুষনির্বিশেষে এ হার ৫৬ শতাংশ। অন্যদিকে, জরিপে অংশ নেওয়া মানুষের ২৮ শতাংশ নারী-পুরুষ জানিয়েছেন, সহকর্মীদের সাথে যৌন সম্পর্কে জড়িয়েছেন তাঁরা।

অর্থাৎ এ জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ভারতে কর্মস্থলে ঊর্ধ্বতন বা অধস্তন সহকর্মীর সাথে যৌন সম্পর্কে জড়ানোর এই হার বলছে, কিছু মানুষের কারণেই পুরো প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। তবে ইন্ডিয়া টুডে ম্যাগাজিনের নির্বাহী সম্পাদক দময়ন্তী দত্ত বলেছেন, কর্মস্থলে যৌন সম্পর্কে জড়ানোর যে হার জরিপে পাওয়া গেছে, তাতে যৌন হয়রানির অভিযোগ আরও বেশি আসা উচিত ছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন তুলনামূলক কম।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় অর্ধেক বলেছেন, কর্মস্থলে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া ব্যক্তিদের চেনেন তাঁরা। এর হার সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে নয়াদিল্লি (৬৯ শতাংশ) ও মুম্বাইয়ে (৬৮ শতাংশ)। অর্থাৎ বড় শহরে যৌন হয়রানির ঘটনাও বেশি। জরিপে অংশ নেওয়া নারী-পুরুষদের ৩৪ শতাংশ বলেছেন, অফিসে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন তাঁরা। এর মধ্যে ৩৪ শতাংশ নারী ও ৩৪ শতাংশ পুরুষ।

এই বিশেষ জরিপটি দু’টি ধাপে করা হয়েছে। প্রতিটি জরিপে অংশ নিয়েছেন ২ হাজার ৫৬১ জন। মোট সংখ্যা ৫ হাজার ১২২। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ বিবাহিত। এ ছাড়া অংশগ্রহণকারীদের ৮০ শতাংশ কমপক্ষে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন এবং বেসরকারি খাতে চাকরি করেন ৮০ শতাংশ। ভারতের মোট ১৯টি শহরে এই জরিপ চালানো হয়। জাতীয়ভাবে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের সাথে সাথে শহরভিত্তিক উপাত্তের তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। গত ১৮ জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারির ২ তারিখ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে এ জরিপ চালানো হয়। বয়সভিত্তিক মোট চার শ্রেণির নারী-পুরুষের মধ্যে জরিপ চালানো হয়। ইন্ডিয়া টুডের এই জরিপে সহযোগিতা করেছে নয়াদিল্লিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মার্কেটিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ অ্যাসোসিয়েটস (এমআরডিএ)।

পুরুষ কেন যৌন হয়রানি করে?
মানুষের যৌন সম্পর্ক বা যৌনতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করে জ্ঞানের যে শাখা, সেটিকে বলা হয় সেক্সোলজি। চেন্নাইভিত্তিক ক্লিনিক্যাল সেক্সোলজিস্ট ডি নারায়ণ রেড্ডি পুরুষের যৌন হয়রানির কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। কর্মস্থলে যৌনতা বিষয়ে ইন্ডিয়া টুডের চালানো জরিপের সূত্র ধরে লেখা নিবন্ধে তিনি বলেছেন, নিপীড়ক পুরুষেরা মূলত দুই ধরনের হয়। এক ধরনের পুরুষ ‘ক্ষমতার অভাবে’ ভোগে এবং অন্যরা ‘ক্ষমতা জাহির’ করতে চায়। প্রথম শ্রেণির পুরুষেরা আত্মবিশ্বাসের সংকটে ভোগে এবং নারীর ওপর যৌন নির্যাতন চালিয়ে সেই অভাব পূরণ করতে চায়। অন্যদিকে, দ্বিতীয় শ্রেণির পুরুষেরা নিজেদের ক্ষমতা ও পৌরুষ জাহির করার জন্য যৌন হয়রানি করে।

তবে এখানেই শেষ নয়। ডি নারায়ণ রেড্ডি বলেন, ধর্ষকেরা সাধারণত নারীর প্রতি সহিংস আচরণ করতে চায় এবং ঘৃণা ও ক্রোধ দ্বারা চালিত হয়। একজন যৌন নিপীড়কের মানসিকতা গড়ে ওঠে তাঁর সামগ্রিক জীবন, বাবা-মায়ের ব্যবহার ও স্কুল-কলেজ জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে।

ভারতীয় পুরুষের মানসিকতা নিয়ে ডি নারায়ণ রেড্ডি লিখেছেন, ‘ভারতীয় পুরুষেরা মূলত অহংকেন্দ্রিক। “না মানে না” এটি তারা কখনো মেনে নিতে পারে না। বিশেষ করে অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যদি পুরুষ হন এবং সেখানকার ক্ষমতা কাঠামো যদি বৈষম্যমূলক হয়, তবে এটি ভয়ানক আকার নেয়। যখন নারী সহকর্মীরা “না” বলেন, তখন সেটি তাঁর অহংয়ে (ইগো) আঘাত করে এবং ওই পুরুষ মরিয়া হয়ে ওঠে।’

যখন ‘না’-এর চেয়ে ‘হ্যাঁ’ সহজ
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার দেওয়া সংজ্ঞা অনুযায়ী, যৌন হয়রানি হলো লিঙ্গবৈষম্যের একটি বিশেষ রূপ। এটি পুরুষ ও নারীর মধ্যে ক্ষমতার অসম সম্পর্ককে নির্দেশ করে। কর্মস্থলে সব ধরনের যৌন হয়রানি ও সহিংসতা থেকে নারীকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা সিডও সনদে বলা হয়েছে।

বেঙ্গালুরুর সেন্টার অব অ্যাডিকশন মেডিসিন অ্যান্ড ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরো সায়েন্সের সাইকিয়াট্রি বিভাগের অধ্যাপক প্রতিমা মূর্তি। ইন্ডিয়া টুডেতে লেখা এক নিবন্ধে তিনি বলেন, যৌন হয়রানির নানা রূপ আছে। এটি মৌখিক ও লিখিত হতে পারে। কোনো নারীর পোশাক, ব্যক্তিগত আচরণ, শরীর নিয়ে মন্তব্য করলে তা যৌন হয়রানির অন্তর্ভুক্ত হবে। আবার যৌনতা সম্পর্কিত ঠাট্টা-মশকরা করা, বার্তা পাঠানো, অন্যের ব্যক্তিগত বা যৌনজীবন নিয়ে গুজব ছড়ানো প্রভৃতিও যৌন হয়রানির মধ্যে পড়ে। আর শারীরিকভাবে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শকে যৌন হয়রানি বলা যাবে।

প্রতিমা বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যৌন হয়রানির শিকার হওয়া নারীরা চুপ থাকেন। যদিও এর মানসিক প্রভাব ভয়ংকর হয়ে থাকে। সাধারণত প্রথাগত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উদ্বেগ, চাকরি হারানোর ঝুঁকি, ক্যারিয়ারের পরবর্তী সময়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা ও পরিবারের চাপেই যৌন হয়রানির ঘটনা গোপন রাখার চেষ্টা করেন নারীরা। অনেক সময় হয়রানির ঘটনায় অভিযোগ বা প্রতিবাদ করার চেয়ে কর্মস্থল ছেড়ে যাওয়াকেই বেছে নেন নারীরা। এর ফলে যেসব পুরুষ হয়রানি করে, তারা একধরনের উৎসাহ পায় এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।

কর্মস্থলে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ভারতে ২০১৩ সালে একটি আইন প্রণয়ন করা হয়। ওই আইন অনুযায়ী অবশ্যই যৌন হয়রানির শিকার নারীকে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে হয়। খুব কম নারীই এমন লিখিত অভিযোগ করেন।

প্রতিমা মূর্তি আরো বলেন, ‘একটি সাধারণ ধারণা আছে যে পূর্ববর্তী কোনো ঘটনার পরম্পরায় বা সম্মতিসূচক বৈধ সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দিলেই অভিযোগ করা হয়ে থাকে। কিন্তু এ ধরনের কারণ ব্যতিক্রম। খুব কম সময়ই হয়।’

বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কর্মস্থলে প্রেমের সম্পর্ক অনেকটা স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু এসব সম্পর্কে সংঘটিত আচরণ ও যৌন হয়রানির মধ্যে পার্থক্য তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন অধ্যাপক প্রতিমা মূর্তি। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় তরুণ-তরুণীরা যৌন হয়রানিমূলক আচরণ কোনটি, তা নির্ধারণ করতে গিয়ে বিভ্রান্ত হন। তাঁরা বুঝতে পারেন না যে এ নিয়ে অভিযোগ করলে কারও ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে কি না। আবার এ নিয়ে নিজেদের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে কি না, তা নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে ওই সব ব্যক্তির পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন আছে।’

সমাজবিজ্ঞানী আনাঘা সারপোতদার বলেন, প্রত্যেকের যৌনতা বিষয়ক আচরণের সীমা নির্ধারণ করা উচিৎ। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্বের সীমারেখা নির্দিষ্ট করা জরুরি। কোনো আচরণ পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট করছে কি না, তা বিচার করতে হবে। বিশেষ করে কর্মস্থলে অনাকাক্সিক্ষত আচরণ বুঝতে পারা এবং সে ক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় প্রতিবাদ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১