শিরোনাম

কতখানি কৃষিজমি কমছে ?

| শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | পড়া হয়েছে 567 বার

কতখানি কৃষিজমি কমছে ?

জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি ২০০১ এর প্রেক্ষাপট অংশে বলা হয়েছে, …বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষি হচ্ছে এদেশের এক-তৃতীয়াংশ জাতীয় আয়ের উৎস এবং দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের জীবিকার অবলম্বন। তাই বাংলাদেশের ভূমি ও পানিসম্পদের গুরুত্বও অপরিসীম। ভূমি হচ্ছে মৌলিক প্রাকৃতিক সম্পদ যা মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী, শিল্পপণ্য, ভোগবিলাস, স্বাস্থ্য রক্ষার উপকরণ ইত্যাদির সব কিছুরই উৎস। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে মাথাপিছু জমির পরিমাণ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে নগরায়ণের প্রবণতা বাড়ছে, শিল্পোন্নয়ন ঘটছে, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির ক্রমাগত সম্প্রসারণ হচ্ছে, যার ফলশ্রুতিতে কৃষিজমির পরিমাণ ক্রমশই সংকুচিত হচ্ছে। ১৯৯২ সনে ব্রাজিলের রিওডিজেনিরোতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ধরিত্রী সম্মেলনে টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেয়া হয়। মাটি, পানি, প্রাণী ও উদ্ভিদসহ মৃত্তিকা সম্পদের কার্যকর ব্যবহার যা মানুষের চাহিদা মিটিয়ে প্রাণিসম্পদ ও পরিবেশগত সম্পর্ককে এক দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে সংরক্ষণ করার চর্চাকেই টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে। টেকসই ভূমিব্যস্থাপনার এক অন্যতম তর্ক কৃষিজমি ঘিরে, যা বাংলাদেশ বা দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, এটি বৈশ্বিক। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (২০১১) ভাষ্য, কৃষিজমির প্রাপ্যতা যেমন অনেক দেশের খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, তেমনি একে রক্ষা করার মানে ভবিষ্যতের গোটা দুনিয়ার খাদ্য চাহিদা মেটানোর এক সুবর্ণ সুযোগ। কৃষি জমি সুরক্ষার প্রশ্নে বাংলাদেশ ২০১৫ সনে ‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন’ নামে একটি আইনের খসড়া তৈরি করেছে।কৃষিজমি সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক জিজ্ঞাসা হলো দেশে কতখানি কৃষিজমি কমেছে এবং কমছে। কিন্তু তার আগে যে বিষয়টি সুস্পষ্ট হওয়া জরুরি তা হলো দেশে কতটুকু কৃষিজমি আছে এবং তাদের শ্রেণী ও বর্তমান হাল কেমন। নিঃসন্দেহে এককালে ‘ছিটমহল’ হিসেবে স্বীকৃত বর্তমান বাংলাদেশের অংশ হওয়া কৃষিজমিসহ দেশের সীমান্তবর্তী বিবাদপূর্ণ কৃষিজমি মোট কৃষিজমির আওতায় আসেনি এখনো। কৃষিজমির পরিসংখ্যান একেক প্রতিষ্ঠান একেকভাবে দিচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও কৃষি তথ্য সার্ভিসের (২০১৫) সূত্র উল্লেখ করে কৃষি মন্ত্রণালয় তাদের ওয়েব পোর্টালে জানিয়েছে, দেশে মোট আবাদযোগ্য জমি ৮৫০৫২৭৮.১৪ হেক্টর, মোট সেচকৃত জমি ৭১২৪৮৯৫.৪১ হেক্টর, আবাদযোগ্য পতিত জমি ২০৪৩৬৬.২৪ হেক্টর। মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (২০১০) এর হিসাবে কৃষিজমির পরিমাণ ৯.৫ মিলিয়ন হেক্টর, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (২০১১) হিসাবে ৮.৫২ মিলিয়ন হেক্টর এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (২০১১) হিসাবে ৯.১ মিলিয়ন হেক্টর। বাংলাদেশ মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশর মাটি ও জমি বিষয়ক পরিসংখ্যান বই, পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর প্রকাশিত কৃষি ডাইরি (২০১১) থেকে দেখা যায় ১৯৭৬ সালে দেশে কৃষিজমি ছিল ৯.৩৯ মিলিয়ন হেক্টর। ১৯৮০-৮১ সালে ৯.৩৮, ১৯৮৫-৮৬ সালে ৯.৪৪, ১৯৯০-৯১ সালে ৯.৭২, ১৯৯৫-৯৬ সালে ৮.৭২, ২০০০-০১ সালে ৮.৪০, ২০০৫-০৬ সালে ৮.৪২ এবং ২০১০-১১ সালে ৮.৫২ মিলিয়ন হেক্টর। তার মানে আদতেই দেশে কতখানি কৃষিজমিন তার কোনো তর্কহীন হদিস নাই। কৃষিজমির পরিমাণ, শ্রেণী, বৈশিষ্ট্য, জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক, বর্তমান অবস্থার তথ্য হালনাগাদ করা জরুরি।কৃষিজমি সুরক্ষা আইনসহ সকলেই বলছে কৃষিজমি কমছে। কিন্তু কতটুকু কমছে এবং কীভাবে? দেশে কী পরিমাণ কৃষিজমি, কীভাবে এবং কখন অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান দেখা যায় না। কৃষি জমির অকৃষিকাতে ব্যবহারের তথ্যে রয়েছে নানাবিধ ফারাক।দেশজুড়েই প্রতিদিন কমছে কৃষিজমি। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে নানা খবর ও প্রতিবেদন। দেশজুড়ে পাহাড় থেকে সমতল, বিল থেকে হাওর, চর থেকে উপকূল, বন থেকে বরেন্দ্র নানাভাবে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। গণমাধ্যমে কৃষিজমি হ্রাস ও বিনষ্টের খবরগুলো নিয়মিত প্রকাশিত ও প্রচারিত হয় না। সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে আবাসন, নগরায়ন, জবরদখল, শিল্পায়ন এসবকেই প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু কৃষিজমি হ্রাসের সঙ্গে জড়িত সমাজ ও রাষ্ট্রের নানবিধ সম্পর্ক ও দরবারগুলো উপেক্ষিত থাকে।ইউএনডিপির (২০০৩) প্রতিবেদন থেকে জানা যায় প্রতি বছর ১ শতাংশ কৃষি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রহমান ও হাসান (২০০৩) তাদের এক গবেষণায় জানিয়েছেন এর পরিমাণ ০.১৩ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (২০১১) ১৯৭৬-৭৭ থেকে ২০১০-১১ সালের কৃষিজমির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে কৃষিজমি হ্রাসের হার ০.২৭%। বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের (২০০৯) এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রতিবছর ১% কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। রহমান (২০১০) তার এক গবেষণায় জানিয়েছেন প্রতি বছর ০.১ শতাংশ কৃষিজমি গৃহায়ণ, রাস্তাঘাট ও শিল্পাঞ্চলের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে শুধুমাত্র মনুষ্যসৃষ্ট উন্নয়ন নয়, প্রাকৃতিকভাবেও কৃষিজমি ক্ষয় হচ্ছে। সিইজিআইস (২০০৮) দেখিয়েছে, ১,৫৬,৭৮০ হেক্টর জমি যমুনা ও পদ্মা নদী ভাঙনে বিলীন হয়েছে। অন্য একটি তথ্য থেকে দেখা যায় ত্রিশ বছরে নদী ভাঙনে বিলীন হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর ভূমি। হাসান ও অন্যরা (২০১৩) বাংলাদেশের কৃষিজমির অবস্থা শীর্ষক এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, ১৯৭৬ সালে দেশে কৃষিজমি ছিল ১৩.১ মিলিয়ন হেক্টর, ২০১০ সালে যা কমে দাঁড়ায় ১২.৪৪ মিলিয়ন হেক্টরে। মানে গত ৩৪ বছরে দেশে ০.৬৬ মিলিয়ন হেক্টর কৃষিজমি কমেছে। দেশে সর্বাধিক কৃষিজমি কমেছে চট্টগ্রামে এবং তা বছরে ১৭,৯৬৮ হেক্টর। রাজশাহীতে ১,৫৯৪৫ হেক্টর, ঢাকায় ১৫,১৩১ হেক্টর, রংপুরে ১১,০৯৬ হেক্টর, খুলনায় ৮,৭৮১ হেক্টর এবং বরিশালে ৬,৬৬১ হেক্টর।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (২০১৫) তথ্য মতে, দেশে মোট ভূমির পরিমাণ প্রায় ১৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন হেক্টর। দেশের মোট ভূমির ১৩ দশমিক ৩ শতাংশজুড়ে বনভূমি, ২০.১ শতাংশে জলাধার, ঘরবাড়ি, শিল্প-কারখানা এবং বাকি ৬৬.৬ শতাংশ কৃষি কাজের জন্য ব্যবহার করা হয়। এর ভেতর আবাদযোগ্য জমি ৮৫ লাখ ৫ হাজার ২৭৮ দশমিক ১৪ হেক্টর। সেচকৃত জমি ৭১ লাখ ২৪ হাজার ৮৯৫ দশমিক ৪১ হেক্টর। এছাড়াও আবাদযোগ্য ‘পতিত’ জমি আছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৬৬ দশমিক ২৪ হেক্টর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, গত ২৭ বছরে দেশে আউশ মৌসুমের জমির পরিমাণ কমেছে ৪৩ লাখ একর এবং আমন মৌসুমের জমি কমেছে দেড় লাখ একর। কিন্তু একই সময়ে আমন মৌসুমে ধানের উৎপাদন বেড়েছে ৫৫ লাখ টন ও বোরো মৌসুমে বেড়েছে এক কোটি ৪৩ লাখ টন।প্রতি বছর কতটুকু কৃষিজমি কমছে এই হিসাব সঠিক ও সুস্পষ্ট হওয়া জরুরি। কোন পদ্ধতিতে এবং কীভাবে এর পরিমাপ হবে তাও নির্দিষ্ট হওয়া জরুরি। কতটুকু কৃষি জমি কীভাবে ব্যবহৃত হলে বলা হবে ‘কৃষিজমি কমে যাচ্ছে’ সেই নির্দেশকগুলো স্পষ্ট করা জরুরি। দেশের প্রতিটি কৃষি বস্নক এবং স্থানীয় পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদে কৃষিজমির তথ্য হালনাগাদ রাখা, যাতে সবসময়ের জন্য কৃষিজমির সামগ্রিক পরিস্থিতি বোঝা যায়। কৃষি জমি হ্রাসের নির্দেশক ও পরিমাপ পদ্ধতি ঠিক করতে হবে। কৃষিজমি কমে যাওয়ার তথ্য সুনির্দিষ্ট না হলে কৃষিজমির সুরক্ষা অসম্ভব। কৃষিজমি হ্রাসের তথ্য নথিভুক্তকরণ প্রক্রিয়া এবং হ্রাসের সংজ্ঞায়নকে সুস্পষ্ট করেই কৃষিজমি সুরক্ষা আইন দ্রুত চূড়ান্ত ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

[লেখক : গবেষক] পাভেল পার্থ


আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০