শিরোনাম

এসব দেখি নকলের হাট-বাজার

| বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২০ | পড়া হয়েছে 152 বার

এসব দেখি নকলের হাট-বাজার

ইদানিং কি একটা হয়েছে জানিনা। ফেসবুকে ছবি দেখলেই কেমন যেনো নকল নকল মনে হয়। আপনারাই না হয় বলুন, এমনটাও কি সম্ভব? এসবও কি হতে পারে? কি যে বলেন না, এসব আমার মটকায় কিছুতেই ঢুকছে না। মানুষ কি তাহলে ডিজিটালাইজডের উপরেও হস্তক্ষেপ করতে চায়? ভালোই, করবে নাই-বা কেন? সুযোগ কি আর বারে বারে আসেনি? বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও তো কেউ একটিবারের জন্যও সুযোগ পায়না। সুযোগ আসলে অনেকটা যৌবনের মতোই। একথা সবাই জানে যে, যৌবন একবার আসবেই। কিন্তু কখন যে সেটি আসে কিংবা আসবে তা আবার অনেকেই জানেনা। পাশের গাঁয়ের বাবুর মতো। তার সঠিক নামটা আমার জানা নাই, অনেকেই জানেন না। সবাই তো তাকে বাবু নামেই ডাকে। নেহায়েত ছোট ছেলেদের মতোই জামাকাপড় পড়ে দিব্যি ঘুরে বেড়ায়। সাধারণ রিকশাঅলাও তার সাথে মজা করে নানান কথা বলে। বাবুর বয়স কতো হলো? নেহায়েত কম করেও যদি ধরি, আড়াই কুড়ি তো হবেই! তারপরও তার নাম বাবু! সবচে’ বড় কথা, এখনও তার যৌবন এলো না!

সেদিন একজনকে দেখলাম। গায়ে মুরুব্বীয়ানা টাইপ পাঞ্জাবী, মাথায় টুপি আর পড়নে সাদা লুঙ্গি। অনেকেই বলে এই রঙের লুঙ্গির নাকি একটা বিশেষ গুণ আছে। সে হয়তো থাকতেই পারে। লুঙ্গির রঙটা বিশেষ হলেই তাকে নিয়ে কথা বলতে হবে কেন? অাসলে মানুষেরই দোষ কি? এতো রঙ থাকতে বিশেষ রঙের লুঙ্গিটাই-বা ওই তিনারা কেন পছন্দ করেন? আসলে সত্য প্রকাশ পাবার এটাই হয়তো একটা কারণ বটে। তো সেই যাই হোক, সবকিছু মিলিয়ে এক্কেবারে ধবল সাজা লোকটাকে আমি প্রথম চিনতেই পারিনি। আচমকা যখনই ওনার মুখনিঃসৃত বিশেষায়িত বুলিগুলো শুনছিলাম, তখন আর বুঝতে কিংবা চিনতে একটুও বাকি রইলো না তিনার পরিচয়। এইতো ক’বছর আগেও রিকশা বাইতো। বউয়ের ভাই পাওনা টাকা দিতে চায়না বলে শালার নামে থানায় মামলা করে নকলটা নিয়ে আমার অফিসে আসছিলো পত্রিকায় লিখে বিষয়টি ফলাও করার জন্য। তিনিই সেই ফালাইন্যা। অবশ্য এ নামটা কেউ ওনার সামনে উচ্চারণ করেনা। ওনিই আজকের হাজী ফালানুর রহমান ফালান! ওইতো পাশাপাশি একটু পাঁচতলা ও একটি চারতলার মালিক! রোজার মাসে নামাজেরর পর মসজিদ থেকে বের হয়েই অমন বুলিগুলো না আওড়ালে কি আমিই তাকে চিনতে পারতাম? তিনিই কিন্ত আবার মসজিদ কমিটির সভাপতি সাহেব!


করোনা শব্দটি নেহায়েত মায়াময় হলেও ‘কভিড-১৯’ ভাইরাসের কারণে এখন ভয়ার্ত। স্বাস্থ্য সহকারি পদটি যে এতো মূল্যবান, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ না হলে অনেকেই বুঝতো না। সেদিন একটি সংবাদ পড়ে হাসব নাকি কাঁদবো ঠিক বুঝে ওঠতে পারিনি। ‘নবজাতককে বাসায় রেখেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন ইউএনও—‘। তাহলে কি সদ্যজাত সন্তানকে ওনার অফিসেই নিয়ে আসার দরকার ছিলো? নাকি ওনারই অফিস কামাই করে সন্তানের পাশে বাসায় থাকাটাই দরকার ছিলো? তিনি চাকরি করেন, তিনি সরকারি কর্মচারি। অফিস করা-কাজ করা-মানুষের সেবা করা, এসবই ওনার একমাত্র দায়িত্ব এবং অবশ্য কর্তব্য। এজন্যই সরকার ইনার গোটা সংসারটাকেই পোষছেন। তিনি ঠিকঠাকমতো তার উপর অর্পিত দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করছেন কি না, সেসবই হলো মূখ্য বিষয়। তিনি সন্তানের পিতা হতে পারলেন কি না, এটি মোটেও কারোর এমনিভাবে জানার মত বিষয়ই নয়। অথচ, এসবই আজকাল আমাদের খুব বেশি করেই জানতে হচ্ছে বৈ কি। কেননা, আজকাল তো এসবই সংবাদে ‘বিশেষ মাত্রা’ হিসেবেই বিবেচিত হয়ে ওঠছে!

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে প্রায় সব জেলাতেই চলছে লকডাউন। তাছাড়া গণপরিবহণ বন্ধ থাকায় অবশিষ্টাঞ্চলও লকডাউনের মতোই। এমনকি উপসানালয়েও এক ধরণের লকডাউন দশাই বিদ্যমান। নিতান্ত প্রয়োজন ব্যতিরেকে ঘরের বাইরে যাওয়া মানা। সরকারি এই বিধি-বিধান কার্যকরে নিয়োজিতরা ছাড়াও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। তদুপরি ব্যক্তি-পরিবার পর্যায়ে সচেতন মানুষজনও নিজ গরজেই দায়িত্বশীলতা বজায় রাখছেন। তথাপিও কিছু বদ মানুষ যে কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ করছেন না, তাও কিন্তু নয়। ঐ যে, ‘কিছু মানুষকে বেহেশতে রাখার ব্যবস্থা করলেও তারা বিকেল বেলায় একটু দোজখ পরিদর্শনে বের হবেনই’ প্রবাদটার মতোই। সেদিন একটা ছবিতে দেখলাম অভাবনীয় এক কাণ্ড। ছোট্ট এক শিশু, বয়স ৬/৭ বছর হবে। এক ধরণের সঙ সেজেই অটোরিকশায় করে মানুষকে সচেতন করার প্রচারণা চালাচ্ছে। অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ তাকে সাধুবাদও জানাচ্ছেন। ঐ যে, ‘মসজিদের ভেতর কথা বলা বন্ধ করতে হুরন মিয়ার ‘এই — বাচ্চারা চুপ চুপ বলে চিৎকার-চেচামেচি’ কারবারের মতো দশা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক যেনো একটা ‘কইয়া দিমু’ টেলিভিশন চ্যানেলই বটে। এখানে অনেকেই অনেক কথা অবলীলাতেই কইয়া দেয়। এর বদৌলতে বেবাকজনে দেখতে-শুনতে পারে। এইতো সেদিন ধানের ভার কাধে করে নিয়ে যাওয়া অবশ্য ভদ্রোচিত পোশাকধারী একজনের কয়েকখান ছবি তারই একজন শুভাকাঙ্ক্ষী নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে
আপলোড করলেন। ছবির ক্যাপশনে লিখলেন,-“ভাই সেলুট আপনাকে। আপনি আজকে দেশের মানুষকে শিখিয়েই দিলেন যে, কি করে অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে হয়। এই মহামারী করোনা ভাইরাসের মধ্যেও রোদে পুড়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শুধু আপনিই না, আপনার অপর সহযোগীদেরও নিয়ে যেভাবে গরীব অসহায় কৃষকদের পাশে এসে দাঁড়ালেন, এমনটা একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ছাড়া কেউই করতে পারে না।” ঐ যে বলছিলাম, ‘কইয়া দিমু’ টেলিভিশন চ্যানেল’র কথা; এবার হিসেব পুুুরোটা একেবারে ঠিকঠাক মিললো তো?সবকিছু কইয়া দিতে আর অবশিষ্ট কিচ্ছুটিও কি বাকি রাখলো?

পিতৃত্যাজ্য সম্পত্তি-ভিটেবাড়ি, ব্যাংক-ব্যালেন্স, দোকানপাট এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্র দাবীদার রমিজ উদ্দিনকে এখনকার দিনের জমিদার বললে হবেনা মোটেও অত্যুক্তি। লকডাউনের কারণে নিজের পরিচালিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে তদ্দ্বারা আমদানির হিসেব ঠিকই চালু রয়েছে। অথচ এতে কর্মরতরা দীর্ঘ সময় ধরেই স্বগৃহে স্বেচ্ছাবন্দী অবস্থাতেই যাপন করছে মানবেতর জীবন। লভ্যাংশ প্রাপ্তি যেহেতু থেমে নেই, প্রতিষ্ঠান চালু করলেই শ্রমিকদেরকে মাইনে দিতে হবে, এতদকারণে ‘প্রতিষ্ঠান চালাতে বাধা নেই’ প্রশাসনের এমন নির্দেশনার পরও প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে বাসার বহুতল ভবনের ছাদে বসে ঘুড়ি উড়ানো উপভোগ করে দিব্যি সময় কাটাচ্ছেন রমিজ উদ্দিন। প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাকে জানালেন,-‘কালকে গরিবদের মাঝে ত্রাণ বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরিচিত একজন সাংবাদিক ম্যানেজ করে দিন, ত্রাণ বিতরণের সচিত্র প্রতিবেদন করার জন্য।’ কর্তার ইচ্ছায় কীর্তন বলে কথা, মালিকের হুকুম রক্ষায় ওই কর্মকর্তা মহাশয় তাই করলেন তো বটেই, ফেসবুকে নিজের টাইমলাইনেও রমিজ সাহেবের মহানুভবতার আলামত প্রদর্শনে করলেন না একটুও কার্পণ্য।

পরীক্ষায় পাশ করতে পরীক্ষার্থীরা নকল করে এটা জানতাম। কিন্তু হাল জামানায় দেখছি সবকিছুতেই কেবল উল্টোচিত্র। নকল চলে এখন পরীক্ষার পরবর্তী জীবনে! সুযোগ পেতে নকল, মুরুব্বী সাজতে নকল, সাংবাদিকতায় নকল, মানবিক হতে নকল, নেতা হতে নকল, দাতা হতে নকল। না জানি বাবা-মা স্বামী-স্ত্রী ছেলে-মেয়ে ইত্যাদি হতেও নকল চলে কি না! লালন সাঁইজী’র ‘এসব দেখি কানার হাট-বাজার’ গানটি বাংলা গানের জগতে এখন অবধি তুমুল জনপ্রিয়। আজকের দিনে সাঁইজী বেঁচে থাকলে ‘এসব দেখি নকলের হাট-বাজার’ শিরোনামে একটি গান লিখতেন কি না আল্লাহ্ মালুম।
লেখক
এইচ.এম. সিরাজ : সাংবাদিক ও শিক্ষানবিশ অ্যাডভোকেট।
নির্বাহী সম্পাদক : দৈনিক প্রজাবন্ধু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০