শিরোনাম

নিকি নিউজের বিশ্লেষণ

ইতিহাসের জঘন্যতম মুসলিম নির্যাতন

ডেস্ক | মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০১৬ | পড়া হয়েছে 474 বার

ইতিহাসের জঘন্যতম মুসলিম নির্যাতন

মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য রাখাইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় এশিয়ার মুসলিমদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। গত সপ্তায় কয়েক হাজার মানুষ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে বিক্ষোভ করেছে। তারা মিয়ানমারের এক সময়ের গৃহবন্দি নেত্রী ও বর্তমানে রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সুচির তীব্র সমালোচনা করেছেন।
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় মিয়ানমারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বর্বর নির্যাতন চালাচ্ছে। একে ইতিহাসের জঘন্যতম মুসলিম নির্যাতন বলা হচ্ছে। এ ধরনের কর্মকা-ের জন্য নীরব ভূমিকা পালন করার জন্য সু চিকে ‘বর্বর’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন কোনো কোনো দেশের নাগরিকরা।
ইন্দোনেশিয়ায় রাজধানী জাকার্তায় ২৫ নভেম্বর ইসলামিক রাজনৈতিক দলের নেতাসহ প্রায় চার শতাধিক মানুষ মিয়ানমারের দূতাবাসের সামনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর বর্বর হামলায় মানববন্ধন করেছেন। তারা মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির নোবেল পুরস্কার ফেরত নেয়ার আহবান জানান। ১৯৯১ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হাতে গৃহবন্দি থাকার সময় শান্তিতে নোবেল পান সু চি।
জাকার্তা মানববন্ধনের প্রধান সমন্বয়ক জুলকাইফ আলী বলেন, ‘আমরা দুঃখিত সু চি। আমরা জানি আপনি শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন। তবে শান্তিতে নোবেল পেলেও আপনার দেশ মিয়ানমারে শান্তি কোথায়? আপনার দেশে মুসলিমরা শান্তিতে নেই। শান্তিতে নোবেল পেয়েও অশান্তির আগুলে জ্বলছে মিয়ানমার।’ দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করার আহ্বান জানানো হয় জাকার্তার ওই মানববন্ধন থেকে।
মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম রয়েছে। যুগযুগ ধরে তারা মৌলিক অধিকার পাওয়া থেকে বঞ্চিত ও অবহেলিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে কাঠখড় পোহাতে হয়েছে সামরিক সরকারের শাসনামলে। ২০১৫ সালের নভেম্বরের নির্বাচনের মাধ্যমে অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি সরকার গঠন করে। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও দেশটির মুসলিমরা নির্যাতনের শিকার
হচ্ছে।
সু চির সরকার এখনো দেশটিতে মুসলিম রোহিঙ্গাদের নির্যাতন রোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ৯ অক্টোবরের পর এ পর্যন্ত ২৫০ রোহিঙ্গা মুসলিম হত্যার শিকার হয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তে বিশেষ অভিযানের সময় মিয়ানমারের ৯ পুলিশ সন্ত্রাসীদের আক্রমণে নিহত হয়। ৯ পুলিশ নিহতের জের ধরে দেশটির সেনা বাহিনী নিরীহ রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন শুরু করে হত্যা করছে।
ওই দুর্ঘটনার পরে মিয়ানমার সেনারা মংড়ু শহর ঘিড়ে ফেলে। এটি রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা। মংড়ুতে সন্দেহভাজন প্রায় ১০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে বলে মিয়ানমারের সেনা বাহিনীর সূত্রে জানা যায়। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে দাবি করেছে। সর্বশেষ হামলায় প্রায় ৩০ হাজার গ্রামবাসীর ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলেও মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এমতাবস্থায় মিয়ানমারের সরকার সংঘাতপূর্ণ এলাকায় গণমাধ্যমের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়। প্রকৃতপক্ষে রাখাইনে কী হচ্ছে তা এখনো সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না।
জাতিসংঘের কর্মকর্তা জন ম্যাকেসিন ২৪ নভেম্বর বিবিসিকে জানান, মিয়ানমার রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গা মুসলিম নিধনে নেমেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দিতে বলা কঠিন। কেন না মিয়ানমার এ ধরনের কর্মকা- নিয়মিতই করছে। মিয়ানমারের লক্ষ্যই যেন সংখ্যালঘু মুসলিমদের নিধন করা।
এদিকে জাতিসংঘের কর্মকর্তা জন ম্যাকেসিনের মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছেন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র জাও হতাই। তিনি বলেন, জাতিসংঘের কর্মকর্তার পেশাদারিত্ব বজায় রেখে কথা বলা উচিত। মিয়ানমারের সরকারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছেন জাতিসংঘের কর্মকর্তা তা আদৌ যথাযথ নয়।
মুখপাত্র আরও বলেন, মিয়ানমারের সেনা বাহিনী কোনো ভুল কাজ করছে না। সেনা বাহিনী কেবল সশস্ত্র বিদ্রোহ থেকে দেশকে সুরক্ষার জন্য কাজ করছে।
তবে জাওয়ের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব চিত্রের অমিল রয়েছে। বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শী ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে বেসামরিক পুরুষদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন করছে মিয়ানমারের সেনা বাহিনী। আর নারীদের ধর্ষণ করার অভিযোগ করেছেন। স্যাটেলাইটের বিভিন্ন চিত্রে এক হাজার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় মিয়ানমারের দূতাবাস ঘেরাও
এদিকে রোহিঙ্গাদের হত্যা ও নারীদের ধর্ষণের বিরুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে মিয়ানমারের দূতাবাস ঘেরাও এবং মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে দেশটির মুসলিম কমিউনিটি। মানববন্ধন এবং দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচিতে বাংলাদেশিসহ অন্যান্য দেশের কয়েক হাজার মুসলমান অংশগ্রহণ করেছেন।
সিউলের স্থানীয় সরকারের অনুমতিক্রমে মুসলিম কমিউনিটি রোববার দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত মিয়ানমার দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে।
মানবন্ধনে মুসলিম কমিউনিটির নেতা আবু বকর সিদ্দিক বলেন, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম নির্যাতন চালাচ্ছে। স্ত্রী-সন্তানের সামনে স্বামীকে নির্যাতন করছে। স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণ করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা ও ধর্ষণ বন্ধ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিতে হবে।
এ সময় দক্ষিণ কোরিয়ার মুসলিম কমিউনিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দও বক্তব্য রাখেন। (টোকিওভিত্তিক নিকি নিউজ অবলম্বনে)
আরও ৮ নৌকা ফেরত
এদিকে কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার নাফ নদীর বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে আটটি নৌকায় করে অনুপ্রবেশের চেষ্টার সময় শতাধিক রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি।
সোমবার ভোরে উপজেলার নাফ নদীসংলগ্ন সীমান্ত থেকে তাদের ফেরত পাঠানো হয় বলে বিজিবির টেকনাফ ২ ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর আবু রাসেল সিদ্দিকী জানান।
গত ৯ অক্টোবর মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষাবাহিনীর তিনটি নিরাপত্তা চৌকিতে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের’ হামলা ঘটনার পর দেশটির সেনা বাহিনীর অভিযানের মুখে রোহিঙ্গারা পালিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিজিবির কক্সবাজার ৩৪ ব্যাটালিয়ন থেকে বলা হচ্ছে, গত ১ নভেম্বর থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত মোট ৪১৬ অনুপ্রবেশ চেষ্টাকারী রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
মেজর আবু রাসেল বলেন, ভোরের দিকে নাফ নদীর ছয়টি পয়েন্ট দিয়ে আটটি নৌকায় করে শতাধিক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ চেষ্টা চালায়।
নাফ নদীর জলসীমার শূন্যরেখা অতিক্রম করে অনুপ্রবেশ চেষ্টায় সময় বিজিবির টহল দলের সদস্যরা এসব রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠায়।
প্রতি নৌকায় অন্তত ১২ থেকে ১৫ জন করে রোহিঙ্গা ছিল বলে জানান তিনি।
এর আগে রোববার টেকনাফের নাফ নদীর বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টার সময় রোহিঙ্গাদের বহনকারী ছয়টি নৌকায় থাকা অন্তত ৬৫ জন এবং উখিয়া সীমান্ত দিয়ে পাঁচজনকে ফেরত পাঠায় বিজিবি।
শনিবার উখিয়া, ঘুমধুম এবং টেকনাফের নাফ নদীর বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ চেষ্টাকালে আট রোহিঙ্গা ও চারটি নৌকা ফেরত পাঠানো হয়েছিল।
এ নিয়ে গত এক সপ্তাহে অনুপ্রবেশ চেষ্টাকালে রোহিঙ্গা বহনকারী অর্ধ-শতাধিক নৌকা ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।


সীমান্ত খুলে দেয়ার
নির্দেশনা চেয়ে রিট
এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশে বাধা দেয়া থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা চেয়ে রিট আবেদন করা হয়েছে। রিটে সাময়িক সময়ের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়ার নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে।
হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিট আবেদনটি দায়ের করা হয়েছে বলে সোমবার জানান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবু ইয়াহিয়া দুলাল।
রিট আবেদনে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশে বাধা দেয়া কেন অমানবিক ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না_এ বিষয়ে রুল চাওয়া হয়েছে। রুল শুনানি না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্র্তীকালীন নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
আইনজীবী আবু ইয়াহিয়া দুলাল বলেন, মঙ্গলবার রিট আবেদনটি শুনানির জন্য হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হবে।
রিট আবেদনে স্বরাষ্ট্রসচিব, আইজিপি, বিজিবির মহাপরিচালক ও কোস্টগার্ডের ডিজিকে বিবাদী করা হয়েছে।

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০